প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

আপনি অন্যদেরকে একথা বোঝাতে চেষ্টা করুন যে, আপনি তাদের কল্যাণ কামনা করেন এবং বাস্তবেও তেমন করুন। আপনার অন্তরে যদি অন্যদের প্রতি ভালবাসা ও কল্যাণ কামনা থাকে, আপনি যদি অন্যদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারে আন্তরিক হন এবং তাদেরকে আপনার আন্তরিকতার বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে তারাও আপনাকে ভালবাসবে।
জনৈক মহিলা ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বারে সবসময় রোগীদের ভীড় উপচে পড়ত। রোগীরা সবসময় তার কাছেই আসতে চাইত। প্রতিটি রোগী নিজেকে এ ডাক্তারের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করত। বস্তুতঃ এ মহিলা ডাক্তার উপযুক্ত আচরণ কৌশল প্রয়োগ করে রোগীদের মন জয় করে ফেলত। তার একটি কৌশল দেখুন। তার একজন মহিলা সহকারী ছিল। তার দায়িত্ব ছিল কোনো রোগী ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বা রোগের ব্যাপারে পরামর্শের জন্য আসলে সে রোগীকে স্বাগত জানিয়ে তার নাম জেনে নেবে এবং তাকে পাঁচ মিনিট পর সাক্ষাতের সময় দেবে। এর মধ্যে সে এ রোগীর ফাইলটি ডাক্তারকে সরবরাহ করবে। ডাক্তার ফাইল দেখে রোগীর নাম, পেশা, সন্তানদের নাম ইত্যাদি সব তথ্য জেনে নিবে।
পাঁচ মিনিট পর রোগী যখন তার কাছে আসত সে রোগীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তার রোগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করত। পাশাপাশি তার সন্তান-সন্তুতি ও কর্মক্ষেত্র সম্পর্কেও খোঁজ-খবর করত। ফলে রোগী মনে করত, এই ডাক্তার তাকে খুব ভালবাসেন। তাই তার সন্তানদের নাম মনে রেখেছেন, তার রোগের বিষয়টিও তার স্মরণে আছে। এমনকি তিনি তার কর্মস্থলের কথাও জিজ্ঞেস করতে ভোলেন নি। ফলে রোগীরা সবসময় তার কাছে আসতেই আগ্রহী থাকে। দেখলেন তো কত সহজে তিনি মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন।

অন্যদের প্রতি আপনার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কথা সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করুন। পিতা-মাতা, স্ত্রী- সন্তান, সহপাঠী-সহকর্মী, প্রতিবেশী সবাইকে যে আপনি ভালোবাসেন তা তাদেরকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিন। আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে স্পষ্ট ভাষায় বলুন, আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমার অন্তরে আপনার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানবোধ রয়েছে। এমনকি সে যদি পাপাচারীও হয় তবুও তাকে বলুন, আপনি আমার কাছে অ-নে-কের চেয়ে প্রিয়। এ কথা বলার কারণে আপনি মিথ্যাবাদী হবেন না। কেননা, লোকটি আপনার কাছে অবশ্যই লক্ষ লক্ষ ইহুদির চেয়ে প্রিয়। বিষয়টি কি এমন নয়? এ ক্ষেত্রে আপনার মেধাকে কাজে লাগান।

আমার এখনও মনে পড়ে, একবার ওমরা করতে গিয়ে তাওয়াফ ও সায়ী করার সময় আমি মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের জন্য নিরাপত্তা, সাহায্য ও সক্ষমতার দোয়া করলাম। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে, আমার বন্ধু-বান্ধব ও সকল প্রিয়জনকে মাফ করে দিন। কখনো কখনো এভাবেও দোয়া করেছি। ওমরা শেষ করে আমি প্রথমে সহজে ওমরা আদায় করতে পারায় আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলাম। এরপর রাত যাপনের জন্য হোটেলে উঠলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইলে একটি ক্ষুদেবার্তা লিখলাম। আমি এইমাত্র ওমরা শেষ করেছি। দোয়ায় আমার প্রিয়জনদের কথা স্মরণ করেছি। আপনিও তাদের একজন। তাই আপনার জন্যও দোয়া করতে ভুলি নি। আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করুন, আপনাকেও ওমরা আদায়ের তওফিক দান করুন। ক্ষুদেবার্তাটি আমি মোবাইলের ফোনবুকে সংরক্ষিত সকল নম্বরে পাঠিয়ে দিলাম। আমার মোবাইলে প্রায় পাঁচশত ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর সংরক্ষিত ছিল। ক্ষুদেবার্তাটি তাদের মধ্যে এমন প্রভাব ফেলেছে যা আমি কল্পনাও করি নি।

তাদের একজন আমাকে লিখে পাঠিয়েছে, আমি আপনার ক্ষুদেবার্তাটি বারবার পড়েছি ও কেঁদেছি। দোয়ায় আমাকে স্মরণ করেছেন জেনে আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
আরেকজন লিখেছে, কী বলে আপনার জবাব দেব, জানি না। আল্লাহ আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।
তৃতীয় একজন লিখেছে, আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি যেন আপনার এ দোয়া কবুল করে নেন। আমি কখনও আপনাকে ভুলব না।এভাবে আমরা মাঝে মাঝে অন্যদেরকে আমাদের ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দিতে পারি। এ জাতীয় সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দিতে পারি যে, জীবনের কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও আমরা তাদেরকে ভুলে যাই নি। তাদের প্রতি রয়েছে আমাদের মনের সুগভীর টান।

বন্ধুদের উদ্দেশ্যে আপনি লিখিত পারেন, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে, জুমার দিনের দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দোয়া করি। আপনার নিয়্যত যদি ভাল হয় তাহলে এটা রিয়া বা লৌকিকতা হবে না। এটা তো মুসলমানদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির মাধ্যম হতে পারে।
আমার এখনও মনে পড়ে, একবার আমি তায়েফ শহরে গ্রীষ্মকালীন এক দাওয়াতি ক্যাম্পেইনে আলোচনা করছিলাম। শিফা পাহাড়ের পাদদেশে এক পার্কে অনুষ্ঠিত সে অনুষ্ঠানে অনেক যুবক উপস্থিত হয়েছিল। একদল যুবক পার্কের অন্য অংশে আনন্দ-ফুর্তিতে ব্যস্ত থাকলেও উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে সততা ও ভালর লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হলে একদল যুবক এগিয়ে এসে সালাম করলো। তাদের একজন যুবকের চুল ছিল বিদেশি স্টাইলে কাটা এবং তার পরণে ছিল টাইট জিন্সের প্যান্ট। সে আমার সঙ্গে মোসাফাহা করলো, আমাকে ধন্যবাদ জানাল। আমিও খুব আন্তরিকতার সঙ্গে তার সালামের উত্তর দিলাম। এখানে উপস্থিত হওয়ার কারণে তাকে ধন্যবাদ জানালাম এবং তার হাত ধরে নাড়া দিয়ে বললাম, তোমার চেহারা তো চমৎকার, একদম দাঈর চেহারার ন্যায়। সে হেসে চলে গেল। দু’সপ্তাহ পরে হঠাৎ ফোন করে সে বললো শায়খ! আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি সে যুবক, যাকে আপনি বলেছিলেন, তোমার চেহারা দাঈর চেহারার ন্যায়। আমি অবশ্যই দাঈ হব, ইনশাআল্লাহ। এর পর সে তার অনুভূতি আমার কাছে ব্যক্তি করলো।দেখলেন তো, আন্তরিকতা ও হৃদয় নিংড়ানো কথার মাধ্যমে মানুষ কীভাবে প্রভাবিত হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারিত্রক মাধুর্য ও অকৃত্রিম ভালবাসা প্রকাশ করে মানুষের হৃদয় জয় করে নিতেন। আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) দু’জনেই মহান সাহাবী। তারা সবসময় নেক কাজে প্রতিযোগিতা করতেন। কিন্তু আবু বকর জয়ী হতেন। ওমর (রা.) তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য শেষরাতে উঠে দেখতেন, আবু বকর (রা.) তার আগেই উঠেছেন। কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার দিতে গিয়ে তিনি দেখতেন, আবু বকর (রা.) এখানেও তার চেয়ে অগ্রসর। যদি কোনো রাতে অতিরিক্ত নফল নামায পড়তেন, তাহলে দেখতেন আবু বকর (রা.) সেখানেও তার ধরাছোয়ার বাইরে।
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের বিশেষ প্রয়োজন পূরণ করার জন্য সবাইকে দান করতে বললেন। ঘটনাক্রমে সে সময় ওমর (রা.) এর পর্যাপ্ত পরিমাণে সম্পদ ছিল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, কোনোদিন যদি আবু বকর (রা.) এর চেয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে আজই সেই দিন। ওমর (রা.) তার অর্ধেক সম্পদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরাবর সমর্পণ করলেন। এতো সম্পদ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরকে সর্বপ্রথম কী জিজ্ঞেস করেছিলেন? তিনি কি সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন? সম্পদের প্রকৃতি তথা স্বর্ণ না রূপা তা জিজ্ঞেস করেছিলেন?
না, তিনি এসব কিছুই জিজ্ঞেস করেন নি। তিনি ওমরকে এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা শুনে ওমর (রা.) বুঝলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালবাসেন। ওমর (রা.) কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ওমর! পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?
ওমর (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাদের জন্য এর সমপরিমাণ রেখে এসেছি।
ওমর (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আগ্রহ নিয়ে বসে রইলেন। আবু বকর (রা.) কখন আসেন, কী নিয়ে আসেন তা দেখবেন। আবু বকর (রা.)-ও তার সামর্থ অনুযায়ী সম্পদ নিয়ে আসলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তা অর্পণ করলেন। ওমর (রা.) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবু বকর (রা.) এর দান দেখছেন এবং তার ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথোপকথন শুনছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রা.)-এর সম্পদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর! তুমি পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রা.)-কে, তার পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসেন, তাদের কল্যাণ কামনা করেন। সবদিয়ে তারা কষ্ট করুক এটা তিনি চান না।

আবু বকর বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি!
আর আমার যা কিছু ছিল তার সব নিয়ে এসেছি। আমি অর্ধেক বা এক চতুর্থাংশ আনি নি বরং আমি সমস্ত সম্পদ নিয়ে এসেছি। তখন ওমর (রা.) এ কথা বলতে বাধ্য হলেন যে,আমি কখনও আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারবনা।
সাহাবীদের প্রত্যেকেই মনে করতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। তাই তারাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা দ্রুত নামায পড়ালেন। নামায শেষে সাহাবায়ে কিরামকে আশ্চর্য হতে দেখে রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি নামায সংক্ষিপ্ত হওয়ায় আশ্চর্য হয়েছ ? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নামাযের মধ্যে আমি একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। তার মায়ের কথা বিবেচনা করে আমি নামায সংক্ষেপ করেছি।
দেখলেন তো অন্যের প্রতি কেমন ছিল তাঁর ভালবাসা। তিনি যে অন্যদেরকে অনেক ভালবাসেন সেটা তিনি আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতেন।
আপনি একা নন…আপনিও আপনার হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করুন। স্পষ্ট করে বলনু, আমি আপনাকে ভালবাসি। আপনার সাথে দেখা করে আমার অনেক ভাল লাগল। আমি মনে করি আপনি অনেক বড় মাপের মানুষ।