প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭, রমজান-শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
নারী পুরুষের পর্দার ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ আমরা জেনেছি। পর্দার গুরুত্ব, পর্দা কিভাবে করত হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম পর্দা সম্পর্কে কী বলেছেন এবং তারা কিভাবে পর্দা করতেন সে সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। পর্দা সংক্রান্ত শতাধিক হাদীস বিষয়ভিত্তিকভাবে এই বইয়ের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে। এখানে আরো কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করছি।
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَشَرُّ نِسَآئِكُمْ الْمُتَبَرَجَاتُ الْمُتَخَيِّلَاتُ وَهُنَّ الْمُنَافِقَاتُ لَايَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْهُنَّ اِلَّا مِثْلُ الْغُرَابِ الْأَعْصَمِ ـ
“আর তোমাদের সবচেয়ে খারাপ মেয়ে তারা, যারা বেপর্দা, অহংকারী, তারা কপট নারী, তাদের মধ্যে লাল রঙের ঠোঁট ও পা-বিশিষ্ট কাকের মত (বিরল) সংখ্যক বেহেশ্তে যাবে।” (বাইহাকী ৭/৮২, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮৪৯ নং)
২. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ ، وَإِنَّهَا اِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ، وَإِنَّهَا أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ إِلَى اللهِ وَهِىَ فِىْ قَعْرِبَيْتِهَا ـ
“নারীর সবটাই আউরাত, বা আবৃতব্য গুপ্তাঙ্গ (গোপনীয় লজ্জাস্থান)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে। সে আল্লাহর বেশি নিকবর্তী থাকে, যখন সে নিজ বাড়ির ভিতরে থাকে।” (তিরমিযী ১১৭৩, ইবনে খুযাইমাহ ৩/৯৩, ইবনে হিব্বান ৫৫৯৯, বায্যার ২০৬১, মিশকাত ৩১০৯)
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
صِنْفَانِ مِنْ اَهْلِ النَّارِ لَمْ اَرَهُمَا قوم معهم سياط كاذناب البقر يضربون بها الناس و نسآء كاسيات عاريات مميلات مائلات رئوسهن كأسنمة البخت المائلة لا يدخلن الجنة ولا يجدن ريحها وان ريحها ليوجد من مسيرة كذا وكذا ـ
“দুশ্রেণীর জাহান্নামীকে আমি দেখিনি। (অর্থাৎ পরবর্তী সময়ে সমাজে এদের দেখা যাবে।) এক শ্রেণী ঐ সকল পুরুষ যারা সমাজে দাপট দেখিয়ে চলে, তাদের হাতে থাকে বাঁকানো লাঠি বা আঘাত করার মত হাতিয়ার, যা দিয়ে তারা মানুষদেরকে মারধোর করে বা কষ্ট দেয়। দ্বিতীয় শ্রেণীর দোজখবাসী ঐ সকল নারী যারা পোশাক পরিহিতা হয়েও উলঙ্গ, যারা পথচ্যুত এবং অন্যদেরকে পথচ্যুত করবে, এদের মাথা হবে উটের পিঠের মত ঢং করে বাঁকানো, এরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতের সুগন্ধও তারা পাবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ অনেক অনেক দূর থেকেও পাওয়া যাবে। (মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৬৮০, ৪/২১৯২)
এখানে যেমন পর্দা পালনে অবহেলা করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে তেমনি মানুষদেরকে কষ্ট দেয়া ও জুলুম করা থেকে কঠিনভাবে সাবধান করা হয়েছে। এদুটি আচরণ সমাজ কলুষিত করে এবং পাশবিকতায় ভরে তোলে, তাই এতদুভয়ের জন্য রয়েছে কঠিনতম শাস্তি।
উপরের হাদীস দুটি থেকে জানা যায় যে, মহিলাদের জন্য চুলের খোপা মাথার উপরে বেঁধে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। চুলের খোপা মাথার পিছনে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবে, যেন তা অতিরিক্ত আকর্ষণীয়তা বা প্রদর্শনীয়তা সৃষ্টি না করে।
৪. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার শেষ জামানার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে যারা ঘরের মত জিন্ (মোটর গাড়ি) তে সওয়ার হয়ে মসজিদের দরজায় দরজায় নামবে। (গাড়ি করে নামায পড়তে আসবে।) আর তাদের মহিলারা হবে অর্ধনগ্না; যাদের মাথা কৃশ উটের কুঁজের মত (খোঁপা) হবে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ করো। কারণ, তারা অভিশপ্তা!—” (আহমাদ ২/২২৩, ইবনে হিব্বান, ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৬৮৩ নং)
৫. আয়েশা (রা.)-এর দুধ চাচার ঘটনা: একবার হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর দুধচাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার দুধচাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দানে তোমার আপত্তি কোথায়? হযরত আয়েশা (রা.) জবাবে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! পুরুষটি তো আমাকে দুধ পান করাননি, দুধ পান করিয়েছে তাঁর ভাই আবূ কুয়াইসের স্ত্রী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, (সতর্কতার জন্য) আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। তুমি তোমার চাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দাও। (বুখারী, আস-সহীহ, খ.৭, পৃ-১০, হাদীস: ৫১০৩)
৬. হযরত সাওদা (রা.)-এর পর্দা: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে, তিনি বলেন, হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)-এর ভাই হযরত ওতবা সাদ (রা.)-কে বলল, জামআর দাসীর গর্ভে যে সন্তানটি আছে, তা আমার সন্তান। কাজেই সে সন্তানের চাচা হিসেবে তুমি তাকে নিয়ে নেবে। ওতবার মৃত্যুর পর সন্তানটি হযরত সাদ (রা.) নিয়ে যাওয়ার পর জাম‘আর ছেলে দাবি করেন, এ আমার ভাই; যেহেতু সে আমার পিতার দাসীর ঔরসজাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফয়সালা দিলেন, ছেলে তার হবে, ছেলের মা যার দাসী ছিল। তখন জাম‘আর ছেলে আবদের কাছে তাকে ফেরত দেয়া হয়। তারপর তিনি হযরত সাওদা (রা.)-কে বললেন, হে সাওদা! তুমি তার থেকে পর্দা করবে। ছেলেটিকে জাম‘আর বলে ফয়সালা করার পরও যেহেতু তার সাথে ওতবার আকৃতির মিল ছিল, তাই তিনি সতর্কতার জন্য উম্মুল মুমিনীনকে নিষেধ করেছিলেন। এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা.) সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি (হযরত সাওদা (রা.)) মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাকে দেখা দেননি। (বুখারী, আস-সহীহ, খ.৭, পৃ-১০, হাদীস: ২৭৫৪)
৭. স্ত্রীকে ঘরের দরজায় দাড়ানো দেখে যুবক সাহাবার রাগ: হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমাদের গোত্রের এক সদ্য বিবাহিত যুবক আমাদের সাথে খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রতিদিন দুপুরে সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুমতি নিয়ে স্ত্রীর কাছে যেত। একদিন অনুমতি চাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার অস্ত্র সাথে নিয়ে যাও। বনু কুরাইযার লোকেরা তোমাকে আক্রমণ করতে পারে। যুবকটি অস্ত্র নিয়ে বাড়ি গিয়ে দেখতে পেল, তার স্ত্রী ঘরের বাইরে দরজার সামনে দাঁড়ানো। স্ত্রীকে এভাবে পর্দা লঙ্ঘন করতে দেখে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। স্ত্রী বলল, থামুন! আগে দেখুন আমি কেন ঘর থেকে বাইরে এসেছি। তখন সে ঘরে গিয়ে দেখল, একটি বিরাট সাপ তার বিছানায় কুণ্ডলি পাকিয়ে বসে আছে।’ (মুসলিম, আস-সহীহ, খ.৭, পৃ-১৭৫৬, হাদীস: ২২৩৬)
৮. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَثَلُ الرَّافِلَةِ فِى الزِّيْنَةِ فِىْ غَيْرِ اَهْلِهَا كَمَثَلِ ظُلْمَةِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَانُوْرَ لَهَا ـ
কিয়ামতের দিন পুরুষের মাঝে সেজেগুজে, হেলেদুলে মাটিতে হেঁচড়ে মন্থর গতিতে চলাচলকারী স্ত্রীবর্গের উপমা হলো এই যে, তারা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। তাদের মাঝে কোনো আলো থাকবে না। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১১৬৭)
৯. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
اَيُّمَا اِمْرَاَةٍ وَضَعَتْ ثِيَابَهَا فِىْ غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا، فَقَدْ هَتَكَتْ سِتْرَ مَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللهِ ـ
যে মহিলা তার স্বামীর ঘর ব্যতিত পোশাক পরিচ্ছদ ছেড়ে অনাবৃত হয় সে যেন আল্লাহ ও তার মধ্যকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলল। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং : ৩৭৫০)
ইমাম আল মানাভী বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, কোনো মহিলা বাড়িতে স্বামী ব্যতীত অন্য কারও সামনে পোশাক-পরিচ্ছদ ছেড়ে অনাবৃত হয়ে কাউকে তার সৌন্দর্য প্রদর্শন করে তবে সে যেন আল্লাহ ও তার মধ্যকার বন্ধক ঢালকে ভেঙ্গে ফেলল।
১০. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
سَيَكُوْنُ فِىْ اٰخِرِ اُمَّتِىْ نِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ، عَلٰى رُئُوْسِهِنَّ كَاَسْئِمَةِ الْبُخْتِ، الْعَنُوْهُنَّ ، فَاِنَّهُنَّ مَلْعُوْنَاتٌ ـ
অচিরেই আমার শেষ জামানার উম্মতের মাঝে এমন কিছু নারীর আগমন ঘটবে যারা পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করেও উলঙ্গ থাকবে। এবং তাদের মাথার উপর উটের পিঠের মতো চুট থাকবে। তোমরা তাদের অভিশাপ কর। যেহেতু তারা অভিশপ্ত। (মুজামুল আওসাত আত তাবারানী, হাদীস নং: ৯৩৩১)
