প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
ইসলাম দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় একটি ধর্ম এবং এটি বাস্তবতাসম্মত। দুনিয়ার একজন মানুষের যা প্রয়োজন তাই রয়েছে ইসলামে। ইসলাম সর্বদা আল্লাহর অনুগত থাকার শিক্ষা দেয়। ইসলাম তার অনুসারীদের দিন দিন আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতির দিকে ধাবিত করে। আর কোন ধর্মমত নেই যা ইসলামের মত অতটা আকর্ষণীয়, বাস্তব এবং সহজ ও সাবলীল। ইসলাম জীবন্ত একটি ধর্ম। এটি মানব চরিত্র ও সভ্যতা গঠনে দিক নির্দেশনা দান করেন। সত্য ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোন সংঘাত নেই। আর এটা শুধু ইসলামেই পরিলক্ষিত। -ব্রাউনটন
ছোট বেলা থেকেই জালাল উদ্দিন খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রভাবে বড় হতে থাকেন। কেননা, তার পিতা-মাতা ছিলেন খ্রিস্টান। লাউডার খ্রিস্টান জীবন দর্শনের প্রতি ছোট বেলাতেই ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু তিনি তথাকথিত খ্রিস্টান মতাদর্শ নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার কাছে খ্রিস্টবাদ সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দের সৃষ্টি করে। বাইবেলকে অতি যত্নে সহকারে পাঠ করে তিনি এর মধ্যে বেশ কিছু জিজ্ঞাসার সন্ধান পান।Failure of Christianity সম্পর্কে বলতে গিয়ে লাউডার লিখেন, আমাদের খ্রিস্টবাদের ব্যর্থতা সম্পর্কে বলতে হচ্ছে। কেননা, এটি মানুষের অন্তরের এবং তার ইচ্ছার অনুবর্তি একটি জীবন্ত বিধান হিসেবে ব্যর্থ। এটি মানুষের আকাঙ্খা এবং জীবনের আবশ্যকতার ধরা ছোঁয়ার বাইরে অবস্থিত। এটি সুন্দর আদর্শ হলেও তা অবাস্তব এবং মানবতার নাগালের বাইরে। ইসলাম হচ্ছে একটি সত্য ধর্র্ম। এটাই মানবতার কল্যাণের ধর্ম এবং সঠিক পথের পাথেয়। মানব পরিবারের প্রতিটি সাফল্যের চাহিদা পূরণ করতে পারে ইসলাম। মুসলামনরা হচ্ছে সে জনগোী যাদের মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ববোধ রয়েছে।
ইসলামকে জানার জন্য এবং সত্যের অনুসন্ধানের জন্য ব্রাউনটন ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা শুরু করেন। ক্রমেই ইসলাম তার কাছে আকর্ষণীয়ভাবে ধরা দেয়। এজন্য তিনি উপমহাদেশ সফর করেন। তিনি পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থান করে ধর্মীয় নেতা ও পণ্ডিতদের সাথে বৈঠক করেন এবং আলাপ আলোচনা করেন। তারপর তিনি ইসলামের পতাকাতলে এসে ধন্য হন। ইসলামের পথে আসার বিষয়টি সম্পর্কে স্যার জালাল উদ্দিন বলেন, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, এটা একটা বাস্তবতা। আমি এ ভ্রাতৃত্ববোধের অসম্ভব আকর্ষণ অন্তর দিয়ে অনুভব করি যখন ১৯৩১ সালে ১৭ নভেম্বর লাহোরের বাদশাহী মসজিদে আমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হই। সেদিন মসজিদে আট হাজারেরও বেশী লোক আমার এ বিরাট ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করার জন্য সমবেত হয়। তাদের প্রত্যেকেই আমাকে দেখতে এবং আমার সাথে বুক মেলাতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে এবং তাদের সকলেই আমাকে ভাই হিসাবে গ্রহণ করে। স্যার জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী গভীর মনোযোগ সহকারে পড়া শুরু করেন। তিনি আশ্বস্থ হলেন যে, কেন অযথা খ্রিস্টানরা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মানবতাবোধকে বুঝতে পেরে জালাল উদ্দিন নিশ্চিত হলেন, এ মহান ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা খুবই অন্যায় এবং বাড়াবাড়ির সামিল। তিনি দেখতে পেলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত বন্য ও পৌত্তলিকতার উপাসক মানুষকে কিভাবে পোশাক পরিয়ে সভ্য হতে শিখিয়েছিলেন। তিনি আরও দেখলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে কর্দমা থেকে পবিত্রতায় মানুষকে টেনে আনলেন। ফলে তারা মর্যাদাসম্পন্ন মানুষে পরিণত হল। আতিথেয়তা তাদের ধর্মীয় দায়িত্বে পরিণত হলো। তারা তাদের মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করে শীঘ্রই সত্যাশ্রয়ী এক আল্লাহর গোলামে পরিণত হলো। আর ইসলাম গোটা দুনিয়ার অতি শক্তিশালী ধর্মে পরিণত হলো। এমন সব ভাল কাজ সম্পন্ন করা হলো যা বর্ণনা করাও অসম্ভব।
ইসলাম এবং বর্তমান দুনিয়ায় এর গুরুত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্যার জালাল উদ্দিন বলেন, ইসলাম দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় একটি ধর্ম এবং এটি বাস্তবতাসম্মত। দুনিয়ায় একজন মানুষের যা প্রয়োজন তাই রয়েছে ইসলামে। ইসলাম সর্বদা আল্লাহর অনুগত থাকার শিক্ষা দেয়। ইসলাম তার অনুসারীদের দিন দিন আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতির দিকে ধাবিত করে। আর কোন ধর্মমত নেই যা ইসলামের মত অতটা আকর্ষণীয়, বাস্তব এবঙ সহজ ও সাবলীল। ইসলাম জীবন্ত একটি ধর্ম। এটি মানব চরিত্র ও সভ্যতা গঠনে দিক নির্দেশনা দান করেন। সত্য ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোন সংঘাত নেই। আর এটা শুধু ইসলামেই পরিলক্ষিত। যে কেউ ইসলামে আল্লাহর একত্বতার সন্ধান পাবে। প্রতিটি মানুষই এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। যারা বোকা কেবল তারাই খোদা বলতে কিছু নেই বলতে পারে। আর সেই লোক নিঃসন্দেহে কাণ্ডজ্ঞানহীন ও বাস্তবতা বর্জিত। মানবতার উন্নয়নে ইসলাম বড় ভূমিকা পালন করেছে। আদর্শ সমাজ ব্যবস্থাই হচ্ছে ইসলামের লক্ষ্য। যদিও বর্তমানে ইসলামী আদর্শ সমাজ নেই, তবে অতীতেই ইতিহাস এটাই বলে যে, এমন একটা সমাজ শুধুমাত্র ইসলামের পথ দেখায়নি। পৃথিবীর এমন কোন পরিবেশ-পরিস্থিতি নেই যার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনার অভাব রয়েছে। বাস্তবিক পক্ষে, ইসলাম পবিত্র কুরআন সহকারে দুনিয়া এসেছে। ইসলাম এসেছে আমাদেরকে অন্ধকারে থেকে আলোর পথে ধাবিত করার জন্য। ইসলাম দিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি, উন্নত নৈতিক বিধান, আদর্শ মানবতার শিক্ষা এবং প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। ইসলাম দুনিয়ার মানুষের জন্য অভূতপূর্ব সব সহায়তা করেছে। উন্নত করেছে মানবÑমানবীকে তার অতীত অবস্থা থেকে। এটা আমার নিকট সত্যিই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, মানুষ কিভাবে ইসলামের মাধ্যমে মুক্তির বিষয়টি অবহেলার চোখে দেখতে পারে! একজন প্রকৃত মুসলমানের নিকট ইসলামই হচ্ছে সবকিছু। তার জীবন ইসলামের শিক্ষার উপর নির্ভরশীল। তার নিকট ইসলাম ছাড়া কোন কিছু কল্পনা করা সম্ভব নয়।
ইসলাম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক বিষয়ে স্যার জালাল উদ্দিন বলেন, দুনিয়ার উন্নতির জন্য আমরা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভব করি। আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যও জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সভ্যতার সমৃদ্ধিতে বিজ্ঞানের জ্ঞান কার্যকর। নৈতিকতা ও আত্মিক উন্নতির জন্য আমরা খোদার জগত থেকে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাই। বিজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা স্রষ্টার সৃষ্টি থেকে তার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারি আর তার স্বভাব ও ইচ্ছার বিষয়টি পবিত্র কুরআন থেকে ধর্মের মাধ্যমে জানতে পারি। উভয় জ্ঞানই অনুসন্ধানের ফল। কিন্তু তাদের মাধ্যম বিভিন্ন। একটি স্রষ্টার সৃষ্টি হতে জ্ঞাত হয় আর অপরটি তার বাণী হতে জ্ঞাত হয়। উভয়ের শেষ গন্তব্য কিন্তু একই। বিজ্ঞান ও ইসলামে কোন বিরোধ নেই। বরং এ দুটি হাত ধরাধরি করে চলে। অথচ আগেকার দিনে যারাই প্রকৃতির গোপনীয়তা বা রহস্য সম্পর্কে তথ্য প্রমাণের চেষ্টা করতো খ্রিস্টানরা তাকে আগুনে পুড়ে ফেলত এবং গীর্জা তাদের প্রতি হতো নিুর। আমরা ভুলে গেলে চলবে না যে, আল্লাহ মানুষের প্রয়োজনেই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ সেগুলো ব্যবহার করবে। বিজ্ঞান আমাদের নির্দেশ করে, সবকিছুই একটি অবিভক্ত নিয়মের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রাকৃতিক সৃষ্টিগুলো একটা সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় অবস্থিত।
স্যার জালাল উদ্দিন মনে করেন, মানুষের সমস্যা ও সংকটের সব সমাধান একমাত্র ইসলামী শিক্ষায় বর্তমান। মানবজাতি ইসলামের মাধ্যমেই কেবল সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে। তার মতে বর্তমান ইউরোপই হচ্ছে মানুষের আত্মিক ও ধর্মীয় অগ্রগতির পথে বড় বাধা। ইউরোপীয়হ সভ্যতার উপর তার মন্তব্য হচ্ছে, ইসলাম দুনিয়ার সব প্রধান প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে ঈর্ষনীয় অবস্থান দখল করে আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অতি সামান্যই বিশ্বাস বা আস্থা রয়েছে।ব্রাউনটনের মতে বর্তমানে মানবতার জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা, প্রতিটি মানুষের আত্মিক মুক্তি এবং মনুষ্য সমাজের জন্য মৌলিক বিধান। আধুনিক ইউরোপ এ তিনটি দিকের উপর আদর্শ স্থানীয় পদ্ধতি নির্মাণের চেষ্টা করলেও বাস্তবে তাতে মানবতার আত্মিক উন্নতি ঘটেনি। বরং ইউরোপই হচ্ছে মানুষের ধর্মীয় উন্নতির পথে প্রধান বাধা। ইউরোপ মানবতার শক্তিকে ধবংশ করেছে এবং সেখানে আত্মিক উন্নতির মানসিকতার বিপর্যয় ঘটেছে। ইউরোপ মানব সভ্যতার জন্য এক ভয়ংকর ক্যান্সারের মূর্তি ধারণ করেছে। এ অবস্থায় ইসলামী সংস্কৃতি ইউরোপ বিকশিত হচ্ছে এবং এটাই জাতিগুলোকে শান্তি ও সংহতির পথে নেতৃত্ব দান করবে। আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে সুখ, শান্তি, ঐক্য ও প্রগতির পথে মানবতাকে অগ্রসর করানো।
