প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৭, রজব-শাবান ১৪৩৮ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ….’ সংখ্যায়

প্রথমত, সহীহ হাদীসের আলোকে শাবান মাস

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখেছি যে, সফর থেকে রজব পর্যন্ত ৬ মাসের কোনো বিশেষ ফযীলত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। শা’বান মাস তদ্রূপ নয়। সহীহ হাদীসে শাবান মাসের নিম্নলিখিত ফযীলতগুলি প্রমাণিত:

১. এই মাসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বেশি বেশি সিয়াম পালন করতে ভালবাসতেন। তিনি সাধারণত এই মাসের অধিকাংশ দিন একটানা সিয়াম পালন করতেন বলে বুখারী ও মুসলিম সংকলিত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বুখারী ও মুসলিমের কোনো কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি শা’বান মাস পুরোটাই নফল সিয়ামে কাটাতেন। তিনি এই মাসে কিছু সিয়াম পালন করতে সাহাবীগণকে উৎসাহ প্রদান করতেন। (বুখারী, আস-সহীহ ২/৬৯৫, ৭০০; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮১০-৮১১, ৮২০)

২. আহমদ, নাসাঈ প্রমুখ মুহাদ্দিস সংকলিত মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বা হাসান পর্যায়ের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই শা’বান মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়; এজন্য এই মাসে বেশি বেশি নফল সিয়াম পালন করা উচিৎ। (নাসাঈ, আস-সুনান ৪/২০১; আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/২০১)

৩. শা’বান মাসের মধ্যম রজনী বা ১৫ই শা’বানের রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল সহীহ ও হাসান হাদীসের পাশাপাশি এই মাসের ফযীলত ও ইবাদতের বিষয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচলিত রয়েছে। এই জাল হাদীসগুলিকে আমরা দু ভাগে ভাগ করতে পারি: ১ সাধারণভাবে শাবান মাস বিষয়ক ও ২.শাবান মাসের মধ্যম রজনী বা ‘শবে বরাত’ বিষয়ক। আমাদের দেশে দ্বিতীয় বিষয়টিই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এজন্য প্রথম বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে আমরা দ্বিতীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।

দ্বিতীয়ত, শাবান মাস বিষয়ক জাল ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা

‘বার চান্দের ফযীলত’ জাতীয় কোনো কোনো পুস্তকে শা’বান মাসের প্রথম রজনীতে বিশেষ সূরা বা আয়াত দিয়ে কয়েক রাক‘আত সালাত আদায়ের কথা, হযরত ফাতিমার (রা) জন্য বখশিশ করার কথা, শা’বান মাসে নির্ধারিত পরিমাণ দরূদ শরীফ পাঠের বিশেষ ফযীলতের কথা, শাবান মাসের যে কোনো জুম্আুর দিবসে বিশেষ সূরা দ্বারা বিশেষ পদ্ধতিতে কয়েক রাক‘আত সালাত আদায়ের কথা এবং সেগুলির কাল্পনিক সাওয়াবের কথা লিখা হয়েছে। মুফতি হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৮-১৯। এগুলি সবই ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। শা’বান মাসে নফল সিয়াম পালন ব্যতীত অন্য কোনো প্রকারের বিশেষ ইবাদতের কথা কোনো হাদীসে বলা হয় নি।

তৃতীয়ত, শবে বরাত বিষয়ক সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস

‘শাবান মাসের মধ্যম রজনী’ বা ‘শবে বারাত’ মুসলিম সমাজে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। এ বিষয়ক সকল সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস সনদসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছি “কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শবে বরাত: ফযীলত ও আমল” নামক গ্রন্থে। এখানে আমি এই বিষয়ক জাল হাদীসগুলির আলোচনা করতে চাই। তবে প্রসঙ্গত এ বিষয়ক সহীহ ও যয়ীফ হাদীসগুলির বিষয়েও কিছু আলোকপাত করতে চাই।

১. মধ্য শাবানের রাত্রির বিশেষ মাগফিরাত

এই বিষয়টি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ তা‘য়ালা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন এবং অংশীবাদী (মুশরিক) ও বিদ্বেষ পোষনকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।”

এই অর্থের হাদীস কাছাকাছি শব্দে ৮ জন সাহাবী: আবূ মূসা আশআরী, আউফ ইবনু মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, মুয়ায ইবনু জাবাল, আবু সা’লাবা আল-খুশানী, আবূ হুরাইরা, আয়েশা ও আবূ বাকর সিদ্দীক (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৪৪৫; বাযযার, আল-মুসনাদ ১/১৫৭, ২০৭, ৭/১৮৬; আহমদ ইবনু হাম্বল, আল-মুসনাদ ২/১৭৬; ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ, পৃ.২২৩-২২৪; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১২/৪৮১; তাবরানী, আল-মুজাম আল-কাবীর, ২০/১০৮, ২২/২২৩; আল-মুজাম আল-আওসাত, ৭/৬৮; বায়হাক্বী, শু’আবুল ঈমান, ৩/৩৮১; ইবনু খুযায়মা, কিতাবুততাওহীদ ১/৩২৫-৩২৬)

এ সকল হাদীসের সনদ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা উপর্যুক্ত গ্রন্থে করেছি। এগুলির মধ্যে কিছু সনদ দুর্বল ও কিছু সনদ ‘হাসান’ পর্যায়ের। সামগ্রিক বিচারে হাদীসটি সহীহ। শাইখ আলবানী বলেন, “হাদীসটি সহীহ। তা অনেক-সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা একটি অন্যটিকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করে।…আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীস আসসাহীহা ৩/১৩৫। এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই রাত্রিটি একটি বরকতময় রাত এবং এই রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন। কিন্তু এই ক্ষমা অর্জনের জন্য শিরক ও বিদ্বেষ বর্জন ব্যতীত অন্য কোনো আমল করার প্রয়োজন আছে কি না তা এই হাদীসে উল্লেখ নেই।

২. মধ্য শাবানের রাত্রিতে ভাগ্য লিখন

কিছু কিছু হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই রাত্রিতে ভাগ্য অনুলিপি করা হয় বা পরবর্তী বছরের জন্য হায়াত-মওত ও রিযক ইত্যাদির অনুলিপি করা হয়। হাদীসগুলির সনদ বিস্তারিত আলোচনা করেছি উপর্যুক্ত পুস্তকটিতে। এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলি অত্যন্ত দুর্বল অথবা বানোয়াট। এই অর্থে কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয় নি।
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে: “আমি তো তা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে এবং আমি তো সতর্ককারী। এই রজনীতে প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।” (সূরা: ৪৪-দুখান: আয়াত : ৩-৪)

এই বাণীর ব্যাখ্যায় তাবিয়ী ইকরিমাহ বলেন, এখানে ‘মুবারক রজনী’ বলতে ‘মধ্য শা’বানের রাতকে’ বুঝানো হয়েছে। ইকরিমাহ বলেন, এই রাতে গোটা বছরের সকল বিষয়ে ফয়সালা করা হয়। (তাবারী, তাফসীর ২৫/১০৭-১০৯)

মুফাস্সিরগণ ইকরিমার এই মত গ্রহণ করেন নি। ইমাম তাবারী বিভিন্ন সনদে ইকরিমার এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করার পরে তার প্রতিবাদ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সঠিক মত হলো, এখানে ‘মুবারক রজনী’ বলতে ‘লাইলাতুল ক্বাদ্র’-কে বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ যে রাত্রিতে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন সেই রাত্রিকে এক স্থানে লাইলাতুল কাদ্র বা ‘মহিমান্বিত রজনী’ বলে অভিহিত করেছেন। (সূরা: ৯৭ কাদ্র: আয়াত ১)

অন্যত্র এই রাত্রিকেই ‘লাইলাতুল মুবারাকা’ বা ‘বরকতময় রজনী’ বলে অভিহিত করেছেন। এবং রাত্রিটি নিঃসন্দেহে রামাদান মাসের মধ্যে; কারণ অন্যত্র আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে,তিনি রামাদান মাসে কুরআন নাযিল করেছেন। (সূরা: ১ বাকারা: আয়াত ১৮৫)

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুবারক রজনী রামাদান মাসে, শাবান মাসে নয়। (তাবারী, তাপসীর ২৫/১০৭-১০৯)
পরবর্তী মুফাস্সিরগণ ইমাম তাবারীর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, ‘মুবারক রজনী’ বলতে এখানে ‘মহিমান্বিত রজনী’ বা ‘লাইলাতুল ক্বাদ্র’ বুঝানো হয়েছে। তাঁদের মতে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ এবং ‘লাইলাতুল ক্বাদ্র’ একই রাতের দুটি উপাধি। দুটি কারণে মুফাস্সিরগণ ইকরিমার তাফসীরকে বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন: প্রথমত, ইকরিমার এই মতটি কুরআনের স্পষ্ট বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ কুরআন কারীমে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ রামাদান মাসে কুরআন নাযিল করেছেন। অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছে যে, একটি মুবারক রাত্রিতে ও একটি মহিমান্বিত রাত্রিতে তিনি কুরআন নাযিল করেছেন। এ সকল আয়াতের সমন্বিত স্পষ্ট অর্থ হলো, আল্লাহ রামাদান মাসের এক রাত্রিতে কুরআন নাযিল করেছেন এবং সেই রাতটি বরকতময় ও মহিমান্বিত। মুবারক রজনীর ব্যাখ্যায় মধ্য শাবানের রজনীর উল্লেখ করার অর্থ হলো এই আয়াতগুলির স্পষ্ট অর্থ বিভিন্ন অপব্যাখ্যা ও ঘোরপ্যাঁচের মাধ্যমে বাতিল করা।

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সাহাবী ও তাবিয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা ‘মুবারক রজনী’-র ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এই রাতটি হলো ‘লাইলাতুল কাদ্র’ বা ‘মহিমান্বিত রজনী’। সাহাবীগণের মধ্য থেকে ইবনু আব্বাস (রা) ও ইবনু উমার (রা) থেকে অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তাবেয়ীগণের মধ্যে থেকে আবু আব্দুর রহমান আল-সুলামী (৭৪ হি), মুজাহিদ বিন জাব্র (১০২ হি), হাসান বসরী (১১০ হি) ক্বাতাদা ইবনু দি‘আমা (১১৭হি) ও আব্দুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম মাদনী (১৮২ হি) বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা সকলেই বলেছেন যে, লাইলাতুল মুবারাকাহ অর্থ লাইলাতুল কাদ্র। (নাহহাস, মা’ আনিল কুরআন ৬/৩৯৫; যামাখশরী, আল-কাশশাফ ৩/৪২৯; ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন ৪/১৬৯০; ইবনু আতিয়্যাহ্, আল-মুহাররার আল ওয়াজীয ৫/৬৮-৬৯; কুরতুবী, তাফসীর ১৬/১২৬; আবু হাইয়্যান, আল-বাহর আল-মুহীত ৮/৩২-৩৩; ইবনু কাছীর, তফিসীর ৪/১৪০; সুয়ূতী, আদদুররুল মানছূর ৫/৭৩৮-৭৪২; আবুস সু’উদ, তাফসীর-ই-আবিস সু’উদ ৮/৫৮; শাওকানী, ফাতহুল ক্বাদীর ৪/৫৭০-৫৭২; আলুসী, রূহুল মা’আনী ১৩/১১০; থানবী, তাফসীর-ই আশরাফী ৫/৬১৬; শানক্বীতী, মুহাম্মদ আমীন, আদওয়া আল-বায়ান ৭/৩১৯; সাবুনী, মুহাম্মদ আলী, সাফওয়াতুত তাফাসীর ৩/১৭০-১৭১; মুফতী শফী, মা’আরেফ আল-কুরআন ৭/৮৩৫-৮৩৬)

৩. মধ্য-শাবানের রাত্রিতে দোয়া-মুনাজাত

মধ্য শাবানের রজনীর ফযীলত বিষয়ে বর্ণিত তৃতীয় প্রকারের হাদীসগুলিতে এই রাত্রিতে সাধারণভাবে দোয়া করার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমালাভের জন্য প্রার্থনার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থে কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস নেই। এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলির মধ্যে কিছু হাদীস দুর্বল এবং কিছু হাদীস জাল।

৪. অনির্ধারিত সালাত ও দোয়া

মধ্য শাবানের রাত্রি সম্পর্কে বর্ণিত কিছু হাদীসে এই রাত্রিতে সালাত আদায় ও দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল হাদীস এই রাত্রির সালাতের জন্য কোনো নির্ধারিত রাক‘আত, নির্ধারিত সূরা বা নির্ধারিত পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়নি। শুধুমাত্র সাধারণভাবে এই রাত্রিতে তাহাজ্জুদ আদায় ও দোয়া করার বিষয়টি এ সকল হাদীস থেকে জানা যায়। এই অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলি প্রায় সবই বানোয়াট পর্যায়ের। দুই একটি হাদীস বানোয়াট না বলে যয়ীফ বা দুর্বল বলে গণ্য করা যায়।

৫. নির্ধারিত রাক‘আত, সূরা ও পদ্ধতিতে সালাত

শবে বরাত বিষয়ক অন্য কিছু হাদীসে এ রাত্রিতে বিশেষ পদ্ধতিতে, বিশেষ সুরা পাঠের মাধ্যমে, নির্দ্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত সালাত আদায়ের বিশেষ ফযীলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী এই অর্থে বর্ণিত সকল হাদীস বানোয়াট। হিজরী চতুর্থ শতকের পরে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর নামে বানিয়ে এগুলি প্রচার করা হয়েছে। এখানে এই জাতীয় কয়েকটি জাল ও বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করছি।

১. ৩০০ রাক’আত, প্রতি রাক‘আতে ৩০ বার সূরা ইখলাস “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে প্রত্যেক রাকাতে ৩০ বার সূরা ইখলাস পাঠের মাধ্যমে ৩০০ রাকাত সালাত আদায় করবে জাহান্নামের আগুন অবধারিত এমন ১০ ব্যক্তির ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” হাদীসটি আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়্যিম বাতিল বা ভিত্তিহীন হাদীস সমূহের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল ক্বাইয়্যেম নাক্বদুল মানকুল ১/৮৫।

২.১০০ রাক‘আত, প্রতি রাক‘আতে ১০ বার সূরা ইখলাস মধ্য শাবানের রজনীতে এই পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন হিজরী চতুর্থ শতকের পরে মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, ৪৪৮ হি, সনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম এই রাত্রিতে এই পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন শুরু হয়। মোল্লা ‘আলী ক্বারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৩/৩৮৮। এ সময়ে বিভিন্ন মিথ্যাবাদী গল্পকার ওয়ায়েয এই অর্থে কিছু হাদীস বানিয়ে বলেন। এই অর্থে ৪টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার প্রত্যেকটিই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর প্রথমটি হযরত আলী ইবনু আবি তালেব (রা) -এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর নামে প্রচারিত: যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকাত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফতিহা ও ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে সে উক্ত রাতে যত প্রয়োজনের কথা বলবে আল্লাহ তায়ালা তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন। লাওহে মাহফুযে তাকে দুর্ভাগা লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরির্বতন করে ৭০ হাজার ফিরিশতা প্রেরণ করবেন যারা তার পাপ রাশি মুছে দেবে, বছরের শেষ পর্যন্ত তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখবে, এছাড়াও আল্লাহ তায়ালা ‘আদান’ জান্নাতে ৭০ হাজার বা ৭ লক্ষ ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যারা বেহেশতের মধ্যে তার জন্য শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ করবে এবং তার জন্য বৃক্ষরাজি রোপন করবে…। যে ব্যক্তি এ নামায আদায় করবে এবং পর কালের শান্তি কামনা করবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য তার অংশ প্রদান করবেন। হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে বানোয়াট ও জাল। এর বর্ণনাকারীগণ কেউ অজ্ঞাত পরিচয় এবং কেউ মিথ্যাবাদী জালিয়াত হিসেবে পরিচিত। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওদু‘আত ২/৪৯-৫০; সুয়ুতী, আল-লাআলী, ২/৫৭-৫৮; ইবনু ইরাক, তানযীহ, ২/৯২-৯৩; মোল্লা ক্বারী, আল-আসরার, পৃ- ৩৩০-৩৩১; আল মাসনু’, পৃ-২০৮-২০৯; শাওকানী, আল ফাওয়ায়েদ ১/৭৫-৭৬)

এ বিষয়ক দ্বিতীয় জাল হাদীসটিতে বানোয়াটকারী রাবীগণ ইবনু উমার (রা)- এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামে বর্ণনা করেছে: “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে এক শত রাকাত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তা‘য়ালা তার কাছে ১০০ জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে দোজখের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে।” এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাতপরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত, ২/৫০-৫১; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ৫/২৭১; সুয়ূতী, আল লাআলী, ২/৫৯; আল-ফাকেহানী, মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব, আখবারু মাক্কাহ ৩/৮৬-৮৭)

এ বিষয়ক তৃতীয় হাদীসটিতে মিথ্যাবাদীগণ বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ আল বাকের (১১৫ হি) থেকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরাতে বর্ণনা করেছে: “যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকাত সালাতে ১০০০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ১০০ ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ৩০ জন তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিবে, ৩০ জন তাকে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ৩০ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ১০ জন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।”

এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাতপরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ ‘আত, ২/৫১; সুয়ূতী, আল-লাআলী, ২/৫৯)

১০০ রাকাত সংক্রান্ত এ বিশেষ পদ্ধতিটি হিজরী চতুর্থ শতাব্দী থেকে বিভিন্ন গল্পকার ওয়ায়েযীনদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং যুগে যুগে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে ভারতীয় ওয়ায়েযগণ এই সালাতের পদ্ধতির মধ্যে প্রত্যেক দুই রাকাতের পরে “তাসবীহুত তারাবীহ”র প্রচলন করেন এবং ১০০ রাকাত পূর্ণ হওয়ার পর কতিপয় সাজদা, সাজদার ভিতরে ও বাহিরে কতিপয় দোয়া সংযুক্ত করেছেন। আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৬ হি) বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হাদীস সমুহের মধ্যে এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। যার সারমর্ম হলো, মধ্য শাবানের রাতে পঞ্চাশ সালামে ১০০ রাকাত সালাত আদায় করতে হবে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ১০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করতে হবে। প্রত্যেক দুই রাকাত পর তাসবীহুত তারাবীহ পাঠ করবে, এর পর সাজদা করবে। সাজদার মধ্যে কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে, এর পর সাজদা করবে। অতঃপর সাজদা থেকে মাথা তুলবে এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর দরূদ পাঠ করবে ও কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে। অতঃপর দ্বিতীয় সাজদা করবে এবং তাতে কিছু নির্ধারিত বানোয়াট দোয়া পাঠ করবে। (আব্দুল হাই লাখনৌবি, আল-আসার আল-মারফুআ, পৃ-১১৩-১১৪)

৩. ৫০ রাক‘আত ইমাম যাহাবী এ হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদীস হিসেবে হাদীসটির বর্ণনাকারী অজ্ঞাত রাবী মুহাম্মাদ বিন সাঈদ আলমীলী আত তাবারার জীবনীতে উল্লেখ করেছেন। উক্ত মুহাম্মাদ বিন সাঈদ এ হাদীসটি তার মতই অজ্ঞাত রাবী মুহাম্মদ বিন আমর আল বাজালী এর সনদে হযরত আনাস (রা) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেন যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ৫০ রাকাত সালাত আদায় করবে, সে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালার কাছে যত প্রকার প্রয়োজনের কথা বলবে তার সবটুকুই পূরণ করে দেয়া হবে। এমনকি লাওহে মাহফুযে তাকে দুর্ভাগ্যবান হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরিবর্তন করে তাকে সৌভাগ্যবান করা হবে। এবং আল্লাহ তা‘আলা তার কাছে ৭ লক্ষ ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যারা তার জন্য বেহেশতে প্রাসাদ নির্মাণ করবে…. এবং ৭০ হাজার একত্ববাদীর জন্য তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে…। ইমাম যাহাবী এই মিথ্যা হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, যে ব্যাক্তি এ হাদীসটি বানোয়াট করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাকে লাঞ্চিত করুন। (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল, ৬/১৬৮-১৬৯)

৪. ১৪ রাক‘আত ইমাম বায়হাক্বী তাঁর সনদে হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে মধ্য শাবানের রাতে ১৪ রাকাত সালাত আদায় করতে দেখেছি। সালাত শেষে বসে তিনি ১৪ বার সূরা নাস, ১ বার আয়তুলকুরসী এবং সূরা তাওবার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, এ সব কাজের সমাপ্তির পর আমি তাঁকে এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি আমাকে যে ভাবে করতে দেখেছ এভাবে যে করবে তার আমল নামায় ২০টি ক্ববুল হজ্বের সাওয়াব লিখা হবে এবং ২০ বছরের ক্ববুল সিয়ামের সাওয়াব তার আমল নামায় লিখা হবে। হাদীসে উল্লেখ করার পর ইমাম বাযহাক্বী বলেন: ইমাম আহমদ বলেছেন যে, এই হাদীসটির আপত্তিকর, জাল, ও বানোয়াট বলে প্রতীয়মান হয়। হাদীসটির সনদে অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারীগণ রয়েছে। (বায়হাক্বী, শুআব আল-ঈমান, ৩/৩৮৬-৩৮৭, হাদীস নং – ৩৮৪১)

অন্যান্য মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করার বিষয়ে ইমাম বাইহাকীর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাওযী ও ইমাম সুয়ুতী বলেন: হাদীসটি বানোয়াট, এর সনদ অন্ধকারাচ্ছন্ন। …. সনদের মধ্যে মুহাম্মদ বিন মুহাজির রয়েছেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন: মুহাম্মদ বিন মুহাজির হাদীস বানোয়াটকারী। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত, ২/৫২; সুয়ূতী, আল-লাআলী, ২/৫৯-৬০)

৫. ১২ রাক‘আত, প্রত্যেক রাক‘আতে ৩০ বার সূরা ইখলাস: জালিয়াতগণ হযরত আবু হুরায়রা (রা) পর্যন্ত একটি জাল সনদ তৈরী করে তাঁর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছে: “যে ব্যক্তি মধ্য শা‘বানের রাতে ১২ রাকাত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকাতে ৩০ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, সালাত শেষ হওয়ার পূর্বেই বেহেশতের মধ্যে তার অবস্থান সে অবলোকন করবে। এবং তার পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে জাহান্নমের আগুন নির্ধারিত হয়েছে এমন দশ ব্যক্তির ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”

এ হাদীসের সনদের অধিকাংশ বর্ণনাকারীই অজ্ঞাত। এছাড়াও সনদের মধ্যে কতিপয় দুর্বল ও পরিত্যাজ্য বর্ণনাকারী রয়েছে। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত, ২/৫২; সুয়ূতী, আল-লাআলী, ২/৫৯)

উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, মধ্য শা’বানের রাতে নির্দ্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দ্দিষ্ট সূরার মাধ্যমে নির্দ্দিষ্ট রাকাত সালাত আদায় সংক্রান্ত হাদীস সমূহ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। মুহাদ্দিসগণ এ ব্যাপারে সকলেই একমত। কিন্তু কতিপয় নেককার ও সরলপ্রাণ ফকীহ মুফাসসির তাঁদের রচনাবলিতে এগুলির জালিয়াতি ও অসারতা উল্লেখ ব্যতীতই এসকল ভিত্তিহীন হাদীস স্থান দিয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ এগুলোর উপর ভিত্তি করে ফতোয়া প্রদান করেছেনও তদনুযায়ী আমল করেছেন, যা পরবর্তীতে এই রীতি প্রসারিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে। মোল্লা আলী ক্বারী (১০১৪ হি) মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায়ের ফযীলত সংক্রান্ত হাদীসগুলির অসারতা উল্লেখপূর্বক বলেন, সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে, যারা সুন্নাতের ইলমের সন্ধান পেয়েছেন তারা এগুলো দ্বারা প্রতারিত হন কি করে ! এ সালাত চতুর্থ হিজরী শতকের পর ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে যার উৎপত্তি হয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে। এব্যাপারে অসংখ্য জাল হাদীস তৈরী করা হয়েছে যার একটিও সঠিক বা নির্ভরযোগ্য নয়। মোল্লা ‘আলী ক্বারী, আল-আসরার, পৃ-৩৩০-৩৩১; ইবনুল ক্বাইয়্যেম, আল-মানার আল-মুনীফ, পৃ-৮৯-৯৯। তিনি আরো বলেন, হে পাঠক, এ সকল ভিত্তিদীন মিথ্যা হাদীস ‘কুতুলকুলুব’, ‘ইহয়িয়া-উ-উলুমিদ্দীন’ ও ইমাম সা‘লাবীর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ থাকার কারণে আপনারা প্রতারিত ও বিভ্রান্ত হবেন না। (মোল্লা ‘আলী ক্বারী, আল মাসনূ, পৃ- ২০৮-২০৯। ইসমাঈল বিন মুহাম্মাদ আজলুনীও (১১৬২ হি) অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। ‘আজলুনী, কাশফুল খাফা, ২/৫৫৪-৫৫৫)

আল্লামা শাওকানী (১২৫০ হি) শবে বারাতের রাত্রিতে আদায়কৃত এই সালাত সংক্রান্ত হাদীসের ভিত্তিহীন হওয়ার কথা উল্লেখ পূর্বক বলেন, এ সকল হাদীস দ্বারা এক দল ফকীহ প্রতারিত হয়েছেন। যেমন ‘ইহয়িয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থকার ইমাম গাযালী ও অন্যান্যরা। এমনিভাবে কতিপয় মুফাস্সিরও প্রতারিত হয়েছেন। এ সালাতের বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের জাল হাদীস রচিত হয়েছে। এ সকল হাদীস মাউযূ বা বানোয়াট হওয়ার অর্থ হলো, এই রাত্রিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নির্ধারিত রাক‘আত সালাত আদায়ের প্রচলন বাতিল ও ভিত্তিহীন। তবে কোনো নির্ধারিত রাক‘আত, সূরা বা পদ্ধতি ব্যতিরেকে সাধারণ ভাবে এই রাত্রিতে ইবাদত বা দোয়া করার বিষয়ে দুই একটি যয়ীফ হাদীস রয়েছে। (শাকানী, আল-ফাওয়ায়েদ ১/৭৬। তৃতীয়, আরো কিছু জাল বা অনির্ভরযোগ্য হাদীস)

১. মধ্য শাবানের রাতে কিয়াম ও দিনে সিয়াম

ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর সুনান গ্রন্থে নিম্নলিখিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন: “আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাতে (সালাতে- দোয়ায়) দন্ডায়মান থাক এবং দিবসে সিয়াম পালন কর। কারণ; ঐ দিন সুর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন রিয্ক অনুসন্ধানকারী আছে কি? আমি তাকে রিয্ক প্রদান করব। কোন দুর্দাশাগ্রস্থ ব্যক্তি আছে কি? আমি তাকে মুক্ত করব। এভাবে সুবহে সাদিক উদয় হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।”

এ হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর উস্তাদ হাসান বিন আলী আল-খাল্লাল থেকে, তিনি আব্দুর রাজ্জাক থেকে, তিনি ইবনু আবি সাব্রাহ থেকে, তিনি ইবরাহীম বিন মুহাম্মদ থেকে, তিনি মুয়াবিয়া বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর থেকে, তিনি তাঁর পিতা আব্দুলাহ বিন জাফার থেকে, তিনি হযরত আলী ইবনু আবী তালিব (রা) থেকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৪৪৪)

ইবনু মাজাহ কর্তৃক সংকলিত হওয়ার কারণে হাদীসটি আমাদের সমাজে বহুল পরিচিত, প্রচারিত ও আলোচিত। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে বানোয়াট বা অত্যন্ত দুর্বল পর্যায়ের বলে চি‎িহ্নত করেছেন।
এ হাদীসটি একমাত্র ইবনু আবি সাব্রাহ বর্ণনা করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কেউ এ হাদীস বর্ণনা করেননি। এ হাদীস আলী ইবনু আবি তালিব থেকে তাঁর কোন ছাত্র বর্ণনা করেননি। আব্দুলাহ বিন জাফর বিন আবি তালিব থেকেও তাঁর কোন ছাত্র হাদীসটি বর্ণনা করেননি। এমনকি মুয়াবিয়া ও ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ থেকে তাঁদের কোনো ছাত্র হাদীসটি বর্ণনা করেননি। শুধুমাত্র ইবনু আবি সাব্রাহ দাবী করেছেন যে, তিনি ইবরাহীম থেকে উক্ত সনদে হাদীসটি শ্রবণ করেছেন। তাঁর কাছ থেকে আব্দুর রাজ্জাক ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। ইবনু আবি সাব্রাহ (১৬২ হি) -এর পূর্ণনাম আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আবি সাব্রাহ। তিনি মদীনার একজন বড় আলিম ও ফক্বীহ ছিলেন। কিন্তু তুলনামূলক নিরীক্ষা ও বিচারের মাধ্যমে হাদীসের ইমামগণ নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিতেন। অসংখ্য ইমাম তাঁকে মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম আহমদ, ইয়াহয়িয়া বিন মাঈন, আলী ইবনুল মাদীনী, বুখারী, ইবনু আদী, ইবনু হিব্বান ও হাকিম নাইসাপূরী অন্যতম। ইবনু হাজার, তাক্বরীব, পৃ. ৬৩২; তাহযীব, ১২/২৫-২৬। এরই আলোকে আল্লামা শিহাব উদ্দীন বিন আবি বকর আল-বুসীরী (৮৪০হি) এ হাদীসের টীকায় বলেছেন, ইবনু আবি সব্রাাহর দুর্বলতার কারণে এ সনদটি দুর্বল। ইমাম আহমদ ও ইবনু মাঈন তাঁকে হাদীস বানোয়াটকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আল-বুছীরী, যাওয়ায়েদ ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ২০৩। শাইখ নাসির উদ্দীন আলবানী বলেছেন, অত্যন্ত দুর্বল বা বানোয়াট। তিনি আরো বলেন, সনদটি বানোয়াট। (আলবানী, দাঈফু সুনানি ইবনি মাজাহ, পৃ. ১০৬; যাঈফাহ, ৫/১৫৪)

২. দুই ঈদ ও মধ্য-শাবানের রাত্রিভর ইবাদত

একটি জাল হাদীসে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাত ও দুই ঈদের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকবে তার অন্তরের মৃত্যু হবেনা যে দিন সকল অন্তর মরে যাবে। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ৫/৩৮১-৩৮২; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান, ৪/৩৯১)
এই হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী উপর্যুক্ত ঈসা ইবনু ইবরাহীম ইবনু তাহমান বাতিল হাদীস বর্ণনাকারী হিসাবে সুপরিচিত। ইমাম বুখারী, নাসায়ী, ইয়াহয়িয়া বিন মাঈন ও আবু হাতিম রাযি ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস একবাক্যে তাকে পরিত্যক্ত বা মিথ্যাবাদী রাবী বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ঈসা ইবনু ইবরাহীম নামক এই ব্যক্তি তার উস্তাদ হিসেবে যার নাম উল্লেখ করেছেন সেই ‘সালামা বিন সুলাইমান’ দুর্বল রাবী বলে পরিচিত। আর তার উস্তাদ হিসেবে যার নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেই ‘মারওয়ান বিন সালিম’ মিথ্যা হাদীস বর্ণনার অভিযোগে অভিযুক্ত। (ইবনুল জাওযী, আল-ইলাল আল-মুতানাহিয়া ২/৫৬২; ইবনু হাজার, আল-ইসাবা ফী তাময়ীযীস সাহাবা ৫/৫৮০; তালখীস আল-হাবীর, ২/৬০৬)

এভাবে আমরা দেখছি যে, এই হাদীসটির সনদের রাবীগণ অধিকাংশই মিথ্যাবাদী বা অত্যন্ত দুর্বল। এরা ছাড়া কেউ এই হাদীস বর্ণনা করেননি। কাজেই হাদীসটি বানোয়াট পর্যায়ের।

এখানে উল্লেখ্য যে, আবূ উমামা (রা) ও অন্যান্য সাহাবী থেকে একাধিক দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘যে ব্যাক্তি দুই ঈদের রাত ইবাদতে জাগ্রত থাকবে তার অন্তরের মৃত্যু হবেনা যে দিন সকল অন্তর মরে যাবে।’ এ সকল বর্ণনায় দুই ঈদের রাতের সাথে মধ্য শাবানের রাতকে কেউ য্ক্তু করেন নি। (ইবনু মাজাহ, আস সুনান ১/৫৬৭/ আল-বূসীরীত, মিসবাহুয যুজাজাহ ২/৮৫)

৩. পাঁচ রাত্রি ইবাদতে জাগ্রত থাকা

মুয়ায ইবনু জাবাল (রা) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, “যে ব্যক্তি পাঁচ রাত (ইবাদতে) জাগ্রত থাকবে তার জন্য জান্নাত অপরিহার্য হবে: যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখের রাত্রি, ৯ তারিখের (আরাফার) রাত্রি, ১০ তারিখের (ঈদুল আযহার) রাত্রি, ঈদুল ফিতরের রাত্রি ও মধ্য শাবানের রাত্রি।”

হাদীসটি ইস্পাহানী তার ‘তারগীব’ গ্রন্থে সুওয়াদ ইবনু সাঈদ- এর সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন। সুওয়াইদ, আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল‘আম্মী থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়াহ্ব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে, তিনি মুয়ায ইবনু জাবাল থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটির বর্ণনাকারী আব্দুর রাহীম ইবনু যাইদ আল-‘আম্মী(১৮৪ হি) নামক ব্যক্তি মিথ্যা ও জাল হাদীস বর্ণনাকারী বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইমাম বুখারী, নাসাঈ, ইয়াহইয়া ইবনু মায়ীন, আহমদ ইবনু হাম্বাল, আবূ হাতিম রাযী, আবূ দাঊদ ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস এই ব্যক্তির মিথ্যাবাদিতার বিষয় উল্লেখ করেছেন। এজন্য এ হাদীসটি মাওযূ বা জাল হাদীস বলে গণ্য। ইবনুল জাওযী, ইবনু তাজার আসকালানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। (আল-মুনযিরী, আত-তারগীর ২/৯৬; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৪/৩৩৬; আলবানী যায়ীফাহ ২/১২)

৪. এই রাত্রিতে রহমতের দরজাগুলি খোলা হয়

আবুল হাসান আলী ইবনু মুহাম্মদ ইবনু ইরাক (৯৬৩ হি) তাঁর মাউযূ বা জাল ও বানোয়াট হাদীস সংকলনের গ্রন্থে ইবনু আসাকির-এর বরাত দিয়ে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হাদীস হিসেবে নিম্নের হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। উবাই ইবনু কা’ব (রা) এ সূত্রে কথিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “মধ্য শাবানের রাতে জিবরাঈল (আ) আমার নিকট আগমন করে বলেন, আপনি দাঁড়িয়ে নামায পড়–ন এবং আপনার মাথা ও হস্তদ্বয় উপরে উঠান। আমি বললাম, হে জিবরাঈল, এটি কোন্ রাত? তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ, এই রাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং রহমতের ৩০০ দরজা খুলে দেওয়া হয়।… তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বাকী গোরস্তানে গমন করেন। তিনি যখন সেখানে সাজদারত অবস্থায় দোয়া করছিলেন, তখন জীবরাঈল সেখানে অবতরণ করে বলেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি আকাশের দিকে মাথা তুলুন। তিনি তখন তাঁর মস্তক উত্তোলন করে দেখেন যে, রহমতের দরজাগুলি খুলে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক দরজায় একজন ফিরিশতা ডেকে বলছেন, এই রাত্রিতে যে সাজদা করে তার জন্য মহা সুসংবাদ…।”

হাদীসটি উদ্ধৃত করে ইবনু ইরাক ইল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীস একটি মাত্র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যে সূত্রের রাবীগণ সকলেই অজ্ঞাত পরিচয় এবং হাদীসটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হিসেবে বিবেচিত। (ইবনু ইরাক, তানযীহ্ ২/১২৬)

৫. পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না

আবূ উমামা বাহিলীর (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামে কথিত আছে, “পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয়না। রজব মাসের প্রথম রাত, মধ্য শাবানের রাত, জুমআর রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।”
এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম ইবনু আসাকির (৫৭১হি) তার ‘তারীখ দিমাশক’ গ্রন্থে আবু সাঈদ বুনদার বিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ রূইয়ানির সূত্রে, তিনি ইবরাহীম বিন আবি ইয়াহয়িয়া থেকে, তিনি আবু কা’নাব থেকে, তিনি আবু উমামা বাহেলী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম সুয়ুতী তাঁর “আল জামে আল সাগীর” গ্রন্থে ইবনু আসাকিরের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদীসটি যয়ীফ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। (সুয়ুতী, আল-জামে আস-সাগীর, ১/৬১০; দায়লামী, আল-ফিরদাউস, ২/১৯৬। নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে বানোয়াট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আলবানী, দাঈফুল জামে, পৃ ৪২; যায়ীফাহ, ৩/৬৪৯-৬৫০)

কারণ এ হাদীসের মূল ভিত্তি হলো ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবী ইয়াহইয়া (১৮৪হি) নামক একজন মুহাদ্দিস। ইমাম মালিক, আহমদ, বুখারী, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, নাসঈ, দারাকুতনী, যাহাবী, ইবনু হিব্বান ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে রাফিযী শিয়া, মুতাযিলী ও ক্বাদরিয়া আক্বীদায় বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছেন এবং মিথ্যাবাদী ও অপবিত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম শাফিয়ী প্রথম বয়সে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বিধায় কোনো কোনো শাফিয়ী মুহাদ্দিস তাঁর দুর্বলতা কিছুটা হাল্কা করার চেষ্টা করেন। তবে শাফিয়ী মাযহাবের অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ এবং অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস এক কথায় তাকে মিথ্যাবাদী ও পরিত্যক্ত বলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

ইমাম শাফিয়া নিজেও তার এই শিক্ষকের দুর্বলতা ও অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি পরবর্তী জীবনে তার সূত্রে কোনো হাদীস বললে তার নাম উল্লেখ না করে বলতেন, আমাকে বলা হয়েছে, বা শুনেছি বা অনুরূপ কোনো বাক্য ব্যবহার করতেন। (ইবনু হিব্বান, আল-মাজরূহীন, ১/১০৫-১০৭; ইবনু ‘আদী, আল-কামিল, ১/৩৫৩-৩৬৭; ইবনুল জাওযী, আদ-দুয়াফা ১/৫১; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল, ১/১৮২-১৮৫; ইবনু হাজার, তাহযীব ১/১৩৭-১৩৯। আব্দুর রায্যাক সান‘আনী বলেন, আমাকে এক ব্যক্তি বলেছেন, তিনি বায়লামানীকে বলতে শুনেছেন, তার পিতা বলেছেন, ইবনু উমার বলেছেন, পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয় না।…”

এই সনদে আব্দুর রায্যাককে যিনি হাদীসটি বলেছেন, তিনি অজ্ঞাত পরিচয়। পরবর্তী রাবী মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রাহমান বিন বায়লামানী হাদীস-জালিয়াত হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। (বুখারী, আততারীখুল কাবীর, ১/১৬৩; ইবনু আদী, আল-কামিল, ৭/৩৮২-৩৮৬; ইবনুল জাওযী, আদ-দুআফা ৩/৭৫; ইবনু হাজার, তাহযীব ৬/১৩৫; ৯/২৬১; তাক্বরীব, পৃ. ৪৯২। উক্ত মুহাম্মাদের পিতা, সনদের পরবর্তী রাবী আব্দুর রাহমান বিন বায়লামানীও দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য রাবী। ইবনু হাজার, তাহযীব, ৬/১৩৫; তাক্বরীব, পৃ. ৩৩৭)

৬. শবে বরাতের গোসল

শবে বরাত বিষয়ক প্রচলিত মিথ্যা কথাগুলির অন্যতম হলো এই রাতে গোসল করার ফযীলত। বিষয়টি যদিও সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও জঘন্য বানোয়াট কথা, তবুও আমাদের সমাজে তা অত্যন্ত প্রচলিত। আমাদের দেশের প্রচলিত প্রায় সকল পুস্তকেই এই জাল কথাটি লিখা হয় এবং ওয়াযে আলোচনায় বলা হয়। প্রচলিত একটি বই থেকে উদ্ধৃত করছি: “একটি হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি উক্ত রাত্রিতে এবাদতের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় গোসল করিবে, সেই ব্যক্তি গোসলের প্রত্যেকটি বিন্দু পানির পরিবর্তে তাহার আমল নামায় ৭০০ (সাতশত) রাকাত নফল নামাযের ছওয়াব লিখা যাইবে। গোসল করিয়া দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়িবে। (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ২৪০। আরো দেখুন: মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ২৬; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃ. ৩০৯)

এই মিথ্যা কথাটি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কঠিন শীতের দিনেও অনেকে গোসল করেন। উপরন্তু ফোটা ফোটা পানি পড়ার আশায় শরীর ও মাথা ভাল করে মোছেন না। এর ফলে অনেকে, বিশেষত, মহিলারা ঠান্ডা-সর্দিতে আক্রান্ত হন। আর এই সকল কষ্ট শরীয়তের দৃষ্টিতে বেকার পন্ডশ্রম ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, সুন্নাতের আলোকে এই রাতে গোসল করে ইবাদত করা আর ওযু করে ইবাদত করার মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য নেই। অনুরূপভাবে এই রাতে গোসল করা এবং অন্য কোনো রাতে গোসল করার মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই।

৭. এই রাত্রিতে নেক আমলের সুসংবাদ

এ বিষয়ে আমাদের দেশের প্রচলিত একটি কথা:
“মহা সুসংবাদ তার জন্য সে শাবান মাসের মধ্যম রজনীতে নেক আমল করে…।” এই কথাটি উপরে উল্লিখিত উবাই উবনু কা’বা (রা) এর নামে প্রচারিত জাল হাদীসটি থেকে গ্রহণ করা।

৮. এই রাত্রিতে হালুয়া-রুটি বা মিষ্টান্ন বিতরণ

এই রাত্রিতে হালুয়া-রুটি তৈরি করা,খাওয়া, বিতরণ করা মিষ্টান্ন বিতরণ করা ইত্যাদি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কর্ম। এই রাত্রিতে এ সকল ইবাদত করলে কোনো বিশেষ সাওয়াব বা অতিরিক্ত সাওয়াব পাওয়া যাবে এই মর্মে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি।

৯. ১৫ শা’বানের দিনে সিয়াম পালন

আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শাবান মাসের বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন, এমনকি প্রায় সারা মাসই সিয়ামরত থাকতেন। আমরা আরো দেখেছি যে,শা’বান মাসের মধ্যম রজনীর ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাত্রিতে সাধারণভাবে দোয়া-ইসতিগফার বা সালাত আদায়ের উৎসাহ জ্ঞাপক কিছু যয়ীফ বা মোটামুটি প্রহণযোগ্য হাদীস রয়েছে। কিন্তু পরদিন সিয়াম পালনের বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীস পাওয়া যায় না। ইবনু মাজাহ সংকলিত আলী (রা)-এর নামে বর্ণিত হাদীসটিতে সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। শবে বরাতের রাতে ১৪ রাক‘আত সালাত আদায় বিষয়ক হাদীসটি জাল। এ বিষয়ক আরেকাট জাল হাদীস আমাদের সমাজে প্রচলিত: “যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করবে, জাহান্নামের আগুন কখনোই তাকে স্পর্শ করবে না। (মকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ২৩৫; মুফতী ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ২৫)

১০. প্রচলিত কিছু ভিত্তিহীন কথাবার্তার নমুনা

আমাদের দেশে প্রচলিত পুস্তকাদিতে অনেক সময় লেখকগণ বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধকে একসাথে মিশ্রিত করেন। অনেক সময় সহীহ হাদীসেরও অনুবাদে অনেক বিষয় প্রবেশ করান যা হাদীসের নামে মিথ্যা পরিণত হয়। অনেক সময় নিজেদের খেয়াল-খুশি মত বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি গ্রন্থের নাম ব্যবহার করেন। এগুলির বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ দয়া করে আমাদের লেখকগণের পরিশ্রম কবুল করুন, তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং আমাদের সকলকে তার সন্তষ্টির পথে চলার তাওফিক প্রদান করুন। শবে বরাত বিষয়ক কিছু ভিত্তিহীন কথা আমাদের দেশে প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃত করছি। প্রায় সকল পুস্তকেই এই কথাগুলি কম বেশি লিখা হয়েছে।

“হাদীসে আছে, যাহারা এই রাত্রিতে এবাদত করিবে আল্লাহ তাআলা আপন খাছ রহমত ও স্বীয় অনুগ্রহের দ্বারা তাহাদের শরীরকে দোজখের অগ্নির উপর হারাম করিয়া দিবেন। অর্থাৎ তাহাদিগকে কখনও দোজখে নিক্ষেপ করিবেন না। হযরত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন- আমি জিবরাইল (আঃ) এর নিকট শুনিয়াছি, যাহারা শা‘বানের চাঁদের ১৫ই তারিখে রাত্রিতে জাগিয়া এবাদত বন্দেগী করিবে, তাহারা শবে ক্বদরের এবাদতের সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। আরও একটি হাদীসে আছে, হযরত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, শাবানে চাঁদের ১৫ই তারিখের রাত্রিতে এবাদতকারী আলেম, ফাজেল, অলী, গাউস, কুতুব, ফকীর, দরবেশ, সিদ্দিক, শহীদ, পাপী ও নিষ্পাপ সমস্তকে আল্লাহ তা’আলা মার্জনা করিবেন। কিন্তু যাদুকর, গণক. বখীল,শরাবখোর, যেনাকার, নেশাখোর ও পিতা-মাতার কষ্টদাতা-এই কয়জনকে আল্লাহ তা’আলা মাফ করিবেন না। আরও একটি হাদীসে আছে, আল্লাহ তা’আলা শাবানে চাঁদের ১৫ই তারিখের রাত্রিতে ৩০০ খাছ রহমতের দরজা খুলিয়া দেন ও তাঁহার বান্দাদের উপর বে-শুমার রহমত বর্ষণ করিতে থাকেন।

কালইউবী কিতাবে লিখিত আছে,- একদিন হযরত ঈসা (আ) জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে খোদাতাআলা ! এ যামানায় আমার চেয়ে বুযুর্গ আর কেহ আছে কি? তদুত্তরে আল্লাহ তা’আলা বলিলেন, হ্যঁ, নিশ্চয়ই। সম্মুখে একটু গিয়াই দেখ। ইহা শুনিয়া ঈসা (আ) সম্মুখের দিকে চলিতে লাগিলেন…. তখন বৃদ্ধ বলিলেন, আমি এতদ্দেশীয় একজন লোক ছিলাম। আমার মাতার দোওয়ায় আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই বুযুর্গী দিয়াছেন। সুতরাং আজ ৪০০ বৎসর ধরিয়া আমি এই পাথরের ভিতরে বসিয়া খোদা তাআলার এবাদত করিতেছি এবং প্রত্যহ আমার আহারের জন্য খোদা তাআলা বেহেশত হইতে একটি ফল পাঠাইয়া থাকেন। ইহা শুনিয়া হযরত ঈসা (আঃ) ছেজদায় পড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন।… তখন আল্লাহ তাআলা বলিলেন, হে ঈসা (আঃ) ! জানিয়া রাখ যে, শেষ যমানার নবীর উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি শাবানের চাঁদের পনরই তারিখের রাত্রে জাগিয়া এবাদত বন্দেগী করিবে ও সেদিন রোযা রাখিবে নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি আমার নিকট এই বৃদ্ধের চেয়েও বেশী বুযুর্গ এবং প্রিয় হইতে পারিবে।
তখন ঈসা (আঃ) কাঁদিয়া বলিলেন, হে খোদা তাআলা ! তুমি আমাকে যদি নবী না করিয়া আখেরী যমানার নবীর উম্মত করিতে তাহা হইলে আমার কতই না সৌভাগ্য হইত ! যেহেতু তাঁহার উম্মত হইয়া এক রাত্রিতে এত ছওয়াব কামাই করিতে পারিতাম।…

হাদীসে আছে, শাবানের চাঁদের চৌদ্দই তারিখের সূর্য অস্ত যাইবার সময় নিম্নলিখিত দোওয়া ৪০ বার পাঠ করিলে ৪০ বৎসরের ছগীরা গুনাহ মাফ হইয়া যাইবে।

… দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত নামায পড়িবে … সূরা ফাতেহার পর প্রত্যেক রাকাতেই সূরা এখলাছ দশবার করিয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়মেই নামায শেষ করিবে। হাদীস শরীফে আছে- যাহারা এই নামায পড়িবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাহাদের চারিটি হাজত পুরা করিয়া দিবেন ও তাহাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন। তৎপর ঐ রাত্রিতে দুই দুই রাকাত আরও চারি রাকাত নফল নামায পড়িবে। … প্রত্যেক রাকাতে সূরা ক্বদর একবার ও সূরা এখলাছ পঁচিশবার পাঠ করিবে এবং এই নিয়মে নামায শেষ করিবে।

হাদীস শরীফে আছে,- মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হইয়া ভুমিষ্ট হয়, উল্লিখিত ৪ রাকাত নামায পড়িলেও সেইরূপ নিষ্পাপ হইয়া যাইবে। (মেশকাত) হাদীস শরীফে আছে, -যাহারা এই নামায পাঠ করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদের পঞ্চাশ বৎসরের গুনাহ মার্জনা করিয়া দিবেন। (তিরমিজী) আরও হাদীসে আছে,-যাহারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মরতবা দরূদ শরীফ হযরত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পাঠ করিবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাহাদের উপর দোজখ হারাম করিবেন। হযরত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন। (সহীহ বোখারী) আর যাহারা উক্ত রাত্রিতে সূরা দোখান সাতবার ও সূরা ইয়াসীন তিনবার পাঠ করিবে, আল্লাহ তাহাদের তিনটি মকছুদ পুরা করিবেন। যথাঃ- (১) হায়াত বৃদ্ধি করিবেন। (২) রুজি-রেজক বৃদ্ধি করিবেন। (৩) সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন।” (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ২৩৬-২৪১)

উপরের কথাগুলি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হলো, গ্রন্থকার এখানে মেশকাত, তিরমিযী ও বুখারীর উদ্ধুতি দিয়েছেন ভিত্তিহীন কিছু কথার জন্য, যে কথাগুলি এই গ্রন্থগুলি তো দূরের কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই নেই। এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সরলপ্রাণ বাঙালি পাঠক। বস্তুত এই পুস্তকটি এবং এই জাতীয় প্রচলিত পুস্তকগুলি জাল ও মিথ্যা কথায় ভরা। আমাদের সমাজে জাল হাদীসের প্রচলনের জন্য এরাই সবচেয়ে বেশি দায়ী।