প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
পঞ্চম অতিরিক্ত লোভ:
তরীকতপন্থীর পক্ষে উহা স্মরণ করা একান্ত কর্তব্য। ছহীহ বোখারী ও মোছলিমে এই হাদিছটি উল্লিখিত আছে আদম সন্তান বার্দ্ধক্যে উপনীত হয় কিন্তু তাহার দুইটি বিষয় যৌবন প্রাপ্ত হয়, অর্থের লোভ ও দীর্ঘায়ুর কামনা।
উক্ত গ্রন্থদ্বয়ে আরও আছে যদি আদম সন্তানের দুই প্রান্তর সম্পদ হইত, তবে অবশ্য সে তৃতীয় প্রান্তরের কামনা করিত। মৃত্তিকা ব্যতীত হজরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত এবনে ওমরের (রাঃ) স্কন্ধদেশ ধারণ পূর্ব্বক বলিয়াছিলেন যে, তুমি পৃথিবীতে প্রবাসী বা পথিকের তুল্য হও এবং নিজেকে গোরবাসিদের মধ্যে গণনা কর।
ইমাম বয়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, জনাব হজরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্রাব করতঃ তায়ম্মাম করিতেন ইহাতে হজরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) বলিতেন, হুজুর, পানি আপনার সন্নিকটে। তদুত্তরে তিনি বলিতেন, আমি পানি পর্য্যন্ত উপস্থিত হইতে অবকাশ না পাইতে পারি।
ইমাম আহমদ বর্ণনা করিয়াছেন, যে সময় হজরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্রাব করতঃ তায়ম্মাম করিতেন, ইহাতে হজরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) বলিতেন, হুজুর, পানি আপনার সন্নিকটে। তদুত্তরে তিনি বলিতেন, আমি পানি পর্য্যন্ত উপস্থিত হইতে অবকাশ না পাইতে পারি।
ইমাম আহমদ বর্ণনা করিয়াছেন, জনাব হজরত নবী করীম (ছাঃ) (ছাহাবা) মোয়াজ (রাঃ) কে ইয়মন দেশে প্রেরণ করিয়াছিলেন, সেই সময় তিনি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি অধিক পরিমাণ ভোগ বিলাস হইতে বিরত থাকিও, কেননা আল্লাহ তায়ালার সেবকগণ বিলাস-ব্যসনের যোগ্য নহেন।
তিরমিযী বর্ণনা করিয়াছেন, হজরত এবনে মাছউদ (রাঃ) বলিয়াছেন, জনাব হজরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোর্ম্মাপত্রের শয্যায় চেটাইর) উপর নিদ্রিত ছিলেন, তৎপরে তিনি জাগরিত হইয়া উঠিলেন, অথচ তাঁহার শরীরে চিহ্ন পড়িয়াছিল। তদ্দর্শনে (হজরত) এবনে মছউদ (রাঃ) বলিলেন, তবে আমি (নরম শয্যা) প্রস্তুত করিয়া আপনার জন্য বিছাইয়া দিতাম। এতদশ্রবণে হজরত বলিলেন, পৃথিবীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হইতে পারে কি? আমার ও পৃথিবীর উদাহরণ এই যে, যেমন একজন আরোহী বৃক্ষের ছায়াতলে বিশ্রাম গ্রহণ করিল এবং (পক্ষণেই) উহা পরিত্যাগ পূর্ব্বক চলিয়া গেল।
তিরমিযীতে আছে, আমার প্রতিপালক আমার জন্য মক্কা শরীফের প্রস্তরময় স্থানকে সুবর্ণ করিয়া দিতে চাহিয়াছিলেন, ইহাতে আমি বলিয়াছিলাম, না। হে আমার প্রতিপালক! বরং আমি একদিবস ক্ষুধা নিবারণ করিব, অন্য দিবস ক্ষুধা সহ্য করিব। যে সময় ক্ষুধার্ত্ত থাকি, তোমার নিকট অনুনয় বিনয় করিব এবং তোমার জেকর করিব। আর যে সময় উদর পূর্ণ করি, তোমার প্রশংসা করিব।
তিরমিযীতে আছে, হজরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লোককে উদগার তুলিতে শ্রবণ করিয়া বলিলেন, তুমি উদগারের মাত্রা কম করিও, কেননা যে ব্যক্তি পৃথিবীতে অধিকতর উদর পূর্ণকারী হইবে, কেয়ামতে অধিকতর ক্ষুধার্ত্ত থাকিবে।
ছহীহ বোখারী ও মোছলিমে আছে, তিনটি বস্তু মৃতের পশ্চাতে গমন করে, তাহার পরিজন অর্থ প্রত্যাগমন করে, কেবল তাহার কার্য্য, নেকী ও বদী তাহার সঙ্গে থাকে।
তিরমিযীতে আছে, আল্লাহ তায়ালার জেকর, প্রেম, বিদ্বান কিম্বা শিক্ষার্থী ব্যতীত পৃথিবী ও পৃথিবীস্থ যাবতীয় বস্তু অভিসম্পাতগ্রস্ত।
ইমাম বয়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, পৃথিবীর প্রেম প্রত্যেক গোনার কার্যের মূল।
ইবনে আবুদ্দুনইয়া বর্ণনা করিয়াছেন, এক ব্যক্তি হজরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, রছুলোল্লাহ! কোন্্ ব্যক্তি লোকের মধ্যে অধিকতর সংসারী বিরাগী? তদুত্তরে হজরত বলিলেন, যে সব ব্যক্তি গোর ও কঙ্কালসার হওয়ার কথা ভুলিয়া না যায়, পৃথিবীর বিলাস বাসনা ত্যাগ করে, পরজগতকে ইহজগত অপেক্ষা সমধিক পছন্দ করে, কল্য জীবনের আশা না করে এবং আপনাকে মৃতদের গণনা করে।
ছহিহ বোখারী ও মোছলিমে আছে, হজরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, আমি বেহেস্তবাসীদিগের মধ্যে অধিকাংশ দরিদ্রকে দেখিতে পাইলাম।
আরও বর্ণিত হইয়াছে, দরিদ্রেরা ধনবানদের ৫ শত বৎসর পূর্ব্বে বেহেস্তে প্রবেশ করিবে।
মেশকাতে আছে, তোমরা অধিক সময় মৃত্যুকে স্মরণ কর, তোমরা গোর জিয়ারত কর, কেননা ইহা তোমাদিগকে সংসার বিরাগী করিবে এবং পরকাল স্মরণ করাইয়া দিবে।
মাওলানা রুমি লিখিয়াছেন, কোন দ্বীপে একটি অপূর্ব পশু আছে। পশুটি প্রভাত হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রান্তরের সমস্ত তৃণ ভক্ষণ করিয়া স্থূলকায় হইয়া পড়ে, রাত্রিকালে কল্য কি ভক্ষণ করিবে এই চিন্তায় আকুল হইয়া অতিশয় ক্ষীণ হইয়া যায়। প্রভাতে দেখিতে পায় যে, প্রান্তর তৃণ ও লতায় পূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। পুনরায় প্রভাত হইতে সন্ধ্যা অবধি উহা ভক্ষণ রকতঃ স্থূলকায় হইয়া রাত্রিতে চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়ে।
এইরূপ আল্লাহ তায়ালা প্রত্যহ মনুষ্যের উপজীবিকা দান করেন কিন্তু মনুষ্য অন্নের চিন্তায় অধীর হইয়া হারাম উপার্জ্জনে রত হইয়া থাকে।
পাঠক, মনে রাখিবেন, আল্লাহ মানুষ্যের জন্য যে উপজীবিকা নির্ধারণ করিয়া রাখিয়াছেন, তাহা নিশ্চয়ই প্রাপ্ত হইবে, তবে হারাম সংগ্রহ করিয়া গোনাহ লিপ্ত হওয়ার কারণ কি?
ইমাম গাজ্জালী লিখিয়াছেন, একটি লোক হজরত ঈছা (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিল, আমি আপনার সঙ্গে বৈরাগ্য অবলম্বন করিব। তিনি বলিলেন, তুমি ঘোর সংসারী এখনও উহার চিহ্ন তোমার ললাটে পরিলক্ষিত হইতেছে, তুমি সংসারবিরাগী হইতে পারিবে না। সে ব্যক্তি নিতান্ত অনুনয় বিনয় করায় হজরতের মন বিগলিত হইল এবং তাহাকে সঙ্গে লইতে স্বীকৃত হইলেন। পথিমধ্যে হজরত তাহার নিকট তিন খন্ড রুটী রাখিয়া দিলেন। এক সময় তিনি ক্ষুধার্থ হইয়া একখানা রুটী নিজে ভক্ষণ করিলেন এবং একখন্ড উক্ত সঙ্গীকে দিলেন, অবশিষ্ট রুটিখানা তাহার নিকট রহিয়া গেল। হযরত এবাদতের জন্য পর্বতের উপর আরোহণ করিলেন, এই অবসরে সে ব্যক্তি উক্ত রুটিখানা একা ভক্ষণ করিবে ধারণায় সাবধানে গোপন করিয়া রাখিল। হযরত ঈছা (আঃ) এবাদত কার্য সমাধা পূর্ব্বক ক্ষুধার্ত্ত হইয়া রুটিখানা চাহিলেন, তদুত্তরে সে ব্যক্তি বলিল উহার সংবাদ আমি অবগত নহি।
হযরত তাহার এই শঠতা বুঝিতে পারিয়া মৌনাবলম্বন করিলেন, তুমি আমার সহিত নদী বক্ষের উপর দিয়া চলিয়া আইস, তৎশ্রবণে সে ব্যক্তি হজরতের সহিত নদী পার হইয়া চলিয়া গেল। তখন হজরত বলিলেন, যে আল্লাহ তায়ালা এরূপ শক্তিমান যে, আমাদিগকে নদী বক্ষ অতিক্রম করিতে ক্ষমতা প্রদান করিলেন, তাঁহার ভারে কিছুরই অভাব নাই, তুমি সত্য করিয়া বল, সেই রুটিখানা কোথায় আছে? সে ব্যক্তি বলিতে লাগিল যে, আমি জানি না। তৎপরে পয়গম্বর (আঃ) একটি হরিণী শাবককে ডাকিলেন, শাবকটি তাঁহার নিকট দ্রুতবেগে চলিয়া আসিলে তিনি উহাকে জবাহ করতঃ উহার গোশত কাবাব করিয়া সঙ্গীকে দিলেন এবং নিজেও ভক্ষণ করিলেন। তৎপরে তিনি আল্লাহর হুকুমে শাবকটি জীবিত করিয়া দিয়া বলিলেন, দেখ, আল্লাহর ভারে আমাদের উপজীবিকার অভাব নাই। এখনও তুমি বল, রুটিখানা কোথায় আছে? তখন সে বলিল, আমি উহা অবগত নহি; তৎপরে হুজুর বালুকাময় প্রান্তরে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, তুমি কিছু বালু তিন অংশে বিভক্ত কর।
সে ব্যক্তি হজরতের আদেশ পালন করিল, হুজুর বলিলেন, আল্লাহ তায়ালা ইহাকে তিনখন্ড সুবর্ণ ইষ্টক করিয়া দাও, তৎক্ষণাৎ তাহা হইয়া গেল। তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলিলেন, একখন্ড ইষ্টক আমার, আর একখন্ড তামার, অবশিষ্ট ইষ্টক খন্ড যাহার নিকট রুটিখানা আছে তাহারই হইবে। তখন সে বলিল, রুটিখানা আমার নিকটে আছে, তৎশ্রবণে ঈসা (আঃ) বলিলেন, তুমি ঘোর সংসারী ও অর্থলোলুপ, এখনও তুমি লোভ ত্যাগ করিতে পার নাই, তুমি আমার নিকট হইতে চলিয়া যাও, এই তিনখন্ড ইষ্টক তোমাকে দিলাম। ইহা বলিয়া হুজুর অন্তর্হিত হইলেন। হঠাৎ দুইজন অশ্বরোহী তথায় উপস্থিত হইয়া উক্ত ব্যক্তির নিকট তিনখন্ড সুবর্ণ ইষ্টক দর্শক পূর্বক তাহার প্রাণবদ করার সঙ্কল্প করিল। সে ব্যক্তি তাহাদের দুরভিষন্ধি বুঝিতে পারিয়া তাহাদিগকে বলিতে লাগিল, একখন্ড ইষ্টক আমার আর দুইখন্ড তোমাদের, তৎশ্রবণে তাহারা সন্তুষ্ট হইয়া ইষ্টকদ্বয় লইয়া একসঙ্গে গমন করিতে লাগিল, তৎপরে উক্ত ব্যক্তি বিষ প্রয়োগ দ্বারা অশ্বারোহীদ্বয়ের প্রাণবধ করার সঙ্কল্প করিয়া বলিতে লাগিল, তোমরা এই স্থানে অপেক্ষা কর, আমি বাজার হইতে কিছু খাদ্য আনয়ন করি।অনন্তর সে বাজারে গমন পূর্বক কিছু খাদ্য ক্রয় করতঃ উহা তিন অংশে বিভক্ত করিয়া একাংশ নিজে ভক্ষণ করিল এবং অবশিষ্ট অংশদ্বয়ে মহাবিষ মিশ্রিত করিয়া তাহাদের সমক্ষে লইয়া গেল। তাহারা উভয়ে উক্ত ব্যক্তির প্রাণনাশের সঙ্কল্প করিয়াছিল, বাজার হইতে প্রত্যাগমন করা মাত্র উভয়ে তাহার প্রাণবধ করিল, তৎপর তাহারা প্রফুল্ল মনে উক্ত খাদ্য ভক্ষণ করিয়া মৃত্যুপ্রাপ্ত হইল। হজরত ঈছা (আঃ) প্রত্যাগমন কালে তিনটি লোককে তিনখন্ড ইষ্টকসহ মৃত্যুশয্যায় শায়িত দেখিয়া বলিলেন, ইহা ঘোর সংসারী অর্থলোলুপদের পরিণাম।
