প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৭, রজব-শাবান ১৪৩৮ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ….’ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৮১ : অনুগ্রহপূর্বক বাম হাত দিয়ে খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টি উদাহরণসহ বুঝিয়ে বলবেন কি?
উত্তর : খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান কাজটি বামহাতে সম্পন্ন করা একেবারেই অনুচিত। আমাদের দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের প্রায় সকল লোকই খাবার গ্রহণের পূর্বে হাত ধুয়ে নেয় এবং ডানহাতে খাবার খায়। তবে শহরের কিছু কিছু শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত লোক style মনে করে অন্যকে দেখিয়ে দেখিয়ে বামহাতে খায়। এসব লোক নিজেদের আধুনিক বা প্রগতিশীল বলে দাবি করে। তারা কাঁটা-চামচের মাধ্যমে বামহাতে খানা খায, যা সত্যিই নিন্দনীয়।
একটি প্রশ্ন করবো, সুপ্রিয় পাঠক! কোনো সেনাকর্মকর্তা কি বামহাতে তার General বা অধিনায়ককে সালাম দিবে ? Can an Army officer salute his General or Commandant with his left hand? will it be acceptable in army discipline? করতে পারে? এটি কি গ্রহণযোগ্য?
আপনারা কি কখনো কোনো দুই রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীকে বামহাতে করদর্মন করতে দেখেছেন? আর আপনিও ঈদের দিনে মহামান্য প্রেসিডেন্ট বা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা কিংবা অপরাপর শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় বামহাতে মুসাফাহা করবেন? এটি কি সভ্যতা বা পররাষ্ট্রনীতির খেলাপ নয়? কোনো সন্তান কি তার বাবার কাছ থেকে বা কোনো ছাত্র কি শিক্ষকের কাছ থেকে বাম হাতে কোনো জিনিস গ্রহণ করে থাকে? কখনোই না। এমনকি আমরা কোনো সময় কাউকে টাকা বা অন্য কিছু দেয়ার প্রয়োজন হলে এবং ডানহাত বন্ধ থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিই। বলি, মনে কিছু নেবেন না, ডানহাটা বন্ধ। এটিই নিয়ম কি সুন্দর অভ্যাস! তাই আমাদের সবারই উচিত নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা মেনে ডানহাতে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণকরা ও পানীয় পান করা।
প্রশ্ন-৮২ : বামহাতে খাওয়া, বামহাতের কাজ বা বামদিক সম্পর্কে কী কী ধারণা আমাদের সমাজে বিদ্যমান?
উত্তর : পবিত্র কুরআনে সূরা ওয়াকিয়াহ-য় বামদিকের লোকের কথা বলা হয়েছে। তাদেরকে দুর্ভাগা বা ‘আস্হাবুল মাশ্আমাত’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আরবরা ‘বামহাত’ ও ‘অশুভ লক্ষণ’ শব্দ দুটোকে সমার্থক শব্দ মনে করে থাকে। তাদের কাছে বামহাত মানে দুর্বলতা। সফরে রওয়ানা হওয়ার সময় যদি কোনো পাখি বামদিক দিয়ে উড়ে যেতো, তাহলে তারা একে অশুভ লক্ষণ মনে করতো। বাংলা ভাষাতেও এটিকে খুব হালকা, সহজ বা অন্যায় কাজ বলে বোঝানো হয়ে থাকে। যেমন, এটি আমার বামহাতের খেলা বা বামহাতের কামাই অর্থাৎ অসৎ উপার্জন।
সুপ্রিয় পাঠক, বামহাতে খাওয়া কোনো style, fashion, culture কোনোটিই নয়। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস অনুযায়ী এটি শয়তানের কাজ। এটা একটি বদ অভ্যাস। এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য। তাছাড়া বামহাতে খেলে কোনো বাড়তি উপকার আছে বলেও মনে হয়না। বড় বড় হোটেলের পার্টিতে দেখা যায়, অনেকে ডানহাতে ছুরি নিয়ে গোশত কেটে ছোট ছোট করে বামহাতে রাখা ফর্ক দিয়ে তা মুখে ঠেলে দেন। আমার প্রশ্ন, কেউ কি এটি দেখে প্রশংসা করবে? এই বদভ্যাসটি কি বদলানো যায় না? আমরা কাকে দেখানোর জন্য বামহাতে ফর্ক নিয়ে খাবার মুখে দিই?
সালামাহ ইবনে আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘একদা একব্যক্তি রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসে বামহাত দিয়ে আহার শুরু করলে তিনি বললেন, তুমি তোমার ডানহাত দিয়ে আহার করো। সে বলল, আমি তা পারবোনা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যেনো না-ই পারো। অহংকারবশেই সে এ আচরণ করেছিল। অতঃপর সে আর কখনো ডানহাত মুখের নিকট তুলতে পারেনি।’ (সহীহ মুসলিম)
প্রশ্ন-৮৪ : সর্বদা আমাদের কোন্ কোন্ কাজ ডানহাতে এবং কোন্ কোন্ কাজ বামহাতে করা উচিত? কাঁটা-চামচের মাধ্যমে কি সকল খাদ্যদ্রব্য ভালোভাবে খাওয়া যায়?
উত্তর : সুপ্রিয় পাঠক! এ দুটো হাত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বড় নি’য়ামত। তিনিই রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ঠিক করে দিয়েছেন, কোন্ হাতের কি কাজ। রামহাতের কাজ এক ধরনের, আর ডানহাতের কাজ অন্য ধরনের। একহাতের কাজ অন্যহাত দিয়ে করলে সমস্যা হয়। যারা ডানহাত দিয়ে সর্বদা খাওয়া-দাওয়া করেন, তারা কি পায়খানা-প্রস্রাব সেরে private parts ডান হাতে পরিষ্কার করবেন?
অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবেই ডানহাতে অধিক শক্তি থাকে এবং তার প্রয়োজনও আছে। মুরগির রান থেকে গোশত বের করে খাওয়া এবং মাছের কাঁটা থেকে সবটুকু নরম অংশ আলাদা করে খাওয়ার জন্য ডানহাত ও দাঁতের বিকল্প আছে কি না তা আমার জানা নেই। সবাই জানেন হাড় ও কাঁটা থেকে গোশত-মাছ পৃথক করা কঠিন কাজ। এটা ডানহাতের কয়েকটি আঙ্গুলের সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। কাঁটা-চামচের মাধ্যমে খেলে অনেক খাবার অপচয় হয়। কারণ সব খাবার knife ও fork দ্বারা পৃথক করা যায় না। তবে হ্যাঁ, কোনো কোনো লোককে আল্লাহ তা’য়ালা বামহাতে শক্তি দিয়েছেন, সেটা ভিন্ন কথা। এটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা চিরাচরিত নিয়মের বহিঃপ্রকাশ, যার দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা তার কুদরতের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নতুবা ভুল বিশ্বাস জন্মানোর সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
যাহোক, আমি যে কথা বলে প্রশ্নের উত্তর দেয়া শেষ করতে চাই, তাহলো অনেক জনগোষ্ঠীর লোক আছে, যারা ১০-১৫ দিন পরও গোসল করে না, যারা পায়খানা-প্রস্রাব করার পরও পানি ব্যবহার করে না, টিস্যু ব্যবহার করে কাজ সেরে নেয় এবং হাত ধৌত করেনা; এমনকি অনেক লোক আছে, যারা স্ত্রী সহবাস করেও উযু-গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করেনা। তাই এসব লোকের হাতে সর্বদা নাপাক ও দূষিত পদার্থ লেগে থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। তাই আমার সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে, যারা খানা খাওয়ার আগে ও পরে হাত ভালোভাবে ধোয়ার গুরুত্ব, প্রয়োজন ও উপকার বুঝতে পারেনা, তারাই কাঁটা-চামচের মাধ্যমে খাওয়ার বিধান চালু করেছে।
সুপ্রিয় পাঠক! কাঁটা-চামচের সাহায্যে খাওয়া নিষেধ নয়। প্রয়োজনে অবশ্যই কাঁটা-চামচ ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে স্যুপ, ডাল ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে চামচ ব্যবহার করতে দোষের কিছু নেই। আর যদি পার্টিতে বা হোটেলে কাঁটা-চামচের মাধ্যমে খানা খাওয়ার প্রয়োজন বেশি অনুভূত হয়, তাহলে knife-টি বামহাতে নিন আর ডানহাতে fork নিন। খাবার কাটাকাটির কাজটি দু’হাতেই সেরে নিন। আর খাবারের লোকমা ডানহাতে রাখা ফর্কের বা spoon এর সাহায্যে বিসমিল্লাহ বলে মুখে নিন। এতে আপনিও তৃপ্তি পাবেন আর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসও মানা হবে। জাফর ইবনে আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে পিতার সূত্রে বর্ণিত।
‘তিনি (আমর ইবনে উমাইয়অ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি বকরির কাঁধের (রান্নাকৃত) গোশত চাকু দিয়া কাটতে এবং তা খেতে দেখেছেন। অতঃপর তিনি নামায পড়তে গেলেন কিন্তু (পুনরায়) উযু করেননি।’ (আত-তিরমিযী)
তবে এখানে একটি হাদীস আমার মনে পড়ছে। হাদীসটি আবু দাউদ শরীফে উদ্ধৃত আছে, ‘ছুরি দ্বারা গোশত কেটে খেয়োনা। কারণ এটি বিদেশি অভ্যাস। তবে দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে খাও। কারণ এটি অধিক উপকারী এবং স্বাস্থ্যসম্মত।’ (আত-তিরমিযী ও আন-নাসাঈ)
