প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

৩৮. ব্যাপক হারে মিথ্যা বেড়ে যাওয়া

১. সমাজে অত্যন্ত ন্যক্কার ও ঘৃণিত একটি অভ্যাস হচ্ছে মিথ্যা বলা। মিথ্যুককে সবাই ঘৃণা করে। অধিক মিথ্যার কারণে এক পর্যায়ে আল্লাহর কাছে সে মহা-মিথ্যুক সাব্যস্ত হয়।

২. ঘরের ভেতর কেউ কখনো মিথ্যা বললে নিষ্ঠার সাথে তওবা না করা পর্যন্ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অবজ্ঞা করতেন। কথা বলা বন্ধ করে দিতেন।

৩. ব্যাপক হারে মিথ্যা বেড়ে যাওয়া কিয়ামাতের অন্যতম নিদর্শন। কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে মিথ্যাকে কেউ-ই ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখবে না। কোথাও কিছু শুনলে যাচাই ছাড়াই তা অন্যের কাছে বর্ণনা করে দেবে।

৪. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- শেষ জামানায় প্রচুর মিথ্যুক দাজ্জালদের আবির্ভাব ঘটবে। কখনোই তোমাদের কানে পৌঁছেনি, এমন কথা তারা বর্ণনা করবে। তাঁদের থেকে তোমরা বেঁচে থেকো! অন্যথায় পথভ্রষ্ট করে তারা তোমাদেরকে ফেতনায় নিক্ষেপ করে দেবে। (মুসলিম)

৫. জাবের বিন ছামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে কতিপয় মিথ্যুকদের আগমন ঘটবে, তাদের থেকে তোমরা নিরাপদ দূরত্বে থেকো! (মুসলিম)

৬. অন্তরে আল্লাহর ভয় হ্রাস পাওয়ায় প্রতিদিন কত মিথ্যা-সংবাদ এবং মিথ্যা কাহিনীর জন্ম হচ্ছে। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সতর্ক করে গেছেন- বিনা যাচাইয়ে কোন কথাই বিশ্বাস করা যাবে না। মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি করে, এমন কথা প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় আমরাও মিথ্যুকদের সাড়িতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে রক্ষা করুন!!

৩৯. ব্যাপক ভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান

১. মামলা মোকদ্দমায় বা বিচার সালিশে সাক্ষ্যদান কালে মিথ্যা কথা বলা মহা অপরাধ! কবিরা গুনাহের অন্যতম। নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সবচে বড় কবিরা গুনাহ কি- তোমাদের বলব? (এভাবে তিনবার বললেন) সাহাবায়ে কেরাম বললেন- বলুন, হে আল্লহর রাসূল! বললেন- আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, মাতা পিতার অবাধ্য হওয়া, (এতক্ষণ দাড়িয়ে ছিলেন, এবার হেলান দিয়ে বসে বলতে লাগলেন) এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। (বুখারী – মুসলিম)

২. শুধু বিচারক বা জজ সাহেব বরাবর মিথ্যা বলা-ই এখানে উদ্দেশ্য নয়; সব ধরনের সাক্ষীর ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে। একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা তুহমত লাগানো। কর্মক্ষেত্রে, অফিসে, কোম্পানিতে বা সংস্থায় প্রধানের কাছে কর্মীদের ব্যাপারে মিথ্যা বলা কলেজ, মাদ্রাসা, ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদের ব্যাপারে টিচারের কাছে মিথ্যা রিপোর্ট দেয়া । সন্তানের ব্যাপারে পিতা বরাবর মিথ্যা বলে পাঠানো- সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

৩. অপর হাদিসে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান এবং মিথ্যা শপথ করে মানুষের অধিকার হরণ থেকে কঠোর সতর্ক করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন মিথ্যা শপথ করে যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের মাল হরণ করল- গোস্বাম্বিত অবস্থায় সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। অতঃপর নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন- যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর তাদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লহ কথা বলবেন না। (সুরা আলে ইমরান -৭৭) (বুখারী)

৪. আবূ উমামা বাহেলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন মিথ্যা শপথ করে যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের সম্পদ হরণ করল, তার উপর আল্লাহ তালা জাহান্নামকে আবশ্যক করে দেবেন, জান্নাত থেকে বঞ্চিত করবেন। এক ব্যক্তি বলল- সামান্য হলেও? বললেন-কাঁটা গাছের মূল্যহীন সামান্য ঢাল হরণ করলেও….!!

৫. আব্দুল্লাহ্ বিন মাস্উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন নিশ্চয়ই কিয়ামাতের পূর্বে সত্য সাক্ষ্য লুকিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যই দেয়া হবে। ( আহ্মাদ্ ৫/৩৩৩)

৪০. সত্যসাক্ষ্য গোপন

১. আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মুসলমানকে -জালেম বা মজলুমকে সাহায্য করার আদেশ করেছেন। জালেমকে জুলুম থেকে বারণ করতে হবে আর মজলুমকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। অপরদিকে সত্য সাক্ষ্য গোপনকে হারাম করেছেন।

২. আল্লাহ তাআলা বলেন

وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে নিশ্চয়ই তার মন পাপাচারী। বস্তুত ঃ আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত। (বাক্বারাহ্ : ২৮৩)

৩. শেষ জমানায় মানুষ অন্যায়ভাবে একে অপরের অধিকার ভোগ করতে থাকবে। ব্যক্তি-স্বার্থ রক্ষায় জেনেও সত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবে। এটাই কিয়ামাতের অন্যতম নিদর্শন।

৪১. হারামকে হালাল জ্ঞান করা

১. ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে ব্যভিচার, মদ্য পান, অশ্লীল নৃত্য পুরুষদের জন্য রেশমী কাপড় পরিধান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শেষ জমানায় একদল মুসলমান এই হারাম বিষয়াবলীকে হালাল মনে করে অবাধ ব্যবহার শুরু করবে। নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একে কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার নিকটতম নিদর্শন বলে চিহ্নিত করেছেন।

২. হালাল জ্ঞান – দু- ভাবে হতে পারে : (১) মনে প্রাণে এগুলোকে হালাল মনে করা; (২) অথবা অধিকাংশ মানুষ-ই এতে লিপ্ত হয়ে যাবে। গুনাহ করার সময় সংকোচ লাগবে না।

৩. আবু মালেক আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন অবশ্যই আমার উম্মাতের মধ্যে একদল লোকের আবির্ভাব হবে, যারা মেয়েদের সাথে অবাধ মেলামেশা , রেশমী কাপড় পরিধান, মদ্য পান এবং গান-বাজনাকে হালাল মনে করবে। আরেক দল উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে মেষপাল নিয়ে অবতরণ করবে, তাদের কাছে ফকির এসে সাহায্যের আবেদন করলে তারা বলবে- আগামীকাল এসো!, এসকল ব্যক্তিকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিবেন, সুউচ্চ পাহাড় (ধ্বংস) তাদের উপর আপতিত হবে। অপর দলকে আল্লাহ (কিয়ামাত পর্যন্তের জন্য) শুকর-বানরের আকৃতিতে পরিবর্তন করে দেবেন।(বুখারী)

৪. অনেক মুসলিম দেশে আজ ভ্যাবিচার ও মদ্য -পান রাষ্ঠীয়ভাবে বৈধ করে দেয়া হয়েছে। সরকারী অনুমোদন নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় বেশ্যা-পাড়া গড়ে উঠেছে। হোটেলগুলোতে সুন্দরী নারীদের দিয়ে ব্যভিচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

৫. আজকাল দিনে-দুপুরে অলিতে-গলিতে অবাধ মদ্য-পান চলছে। অনেক মুসলিম দেশ- মদের ব্যবসা এবং বাজারে বিদেশী মদের আমদানিকে বৈধ করেছে।

৬. আবু মালেক আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন অবশ্যই আমার উম্মাতের একদল – মদ্য-পানে লিপ্ত হবে। (ব্যবসার সুবিধার্থে) মদের নামকে তারা পরিবর্তন করে দেবে। তাদের মাথার উপর গান -বাজনা এবং নর্তকীদের নৃত্যানুষ্ঠান শোভা পাবে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মাটির নিচে ধ্বসে দেবেন। কতিপয়কে শুকর-বানরে পরিবর্তন করে দেবেন। (ইবনে মাজা)