প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর অতিপ্রাকৃতিক জগতের উপর কর্তৃত্ব আছে এবং অতিপ্রাকৃতিক অ-বস্তুগত কিংবা অলৌকিকভাবে কাউকে সাহায্য করতে বা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে বলে বিশ্বাস করাও সুস্পষ্ট শিরকের পর্যায়ভুক্ত। তাই যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর সম্পর্কে বিশ্বাস পোষণ করে যে, সে অলৌকিক শক্তির অধিকারী এবং অলৌকিকভাবেই কোন ঘটনা সংঘটিত করতে, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য, রোজগারহীনকে রোজগার, সন্তানহীনকে সন্তান দিতে পারে, তাহলে সে হবে মুশরিক। কেননা সে এমন একটি শক্তি এমন এক জনের আছে বলে বিশ্বাস করছে যা মূলত-ই তার নেই, থাকতে পারে না, যে শক্তি থাকতে পারে কেবল আল্লাহর এবং তা একান্তভাবে তাঁরই রয়েছে।

২. কোন পিপাসার্ত ব্যক্তি যদি কারো নিকট পানি চায়, তবে তা স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এই কাজ হবে, তাতে অলৌকিকতা অতিপ্রাকৃতিক শক্তি বিশ্বাসের কোন ব্যাপার নেই। কিন্তু কোন মৃত নবী, পীর, গাওস, ওলীর কবরের নিকট গিয়ে অনাবৃষ্টিকালে যদি বৃষ্টিপাত চাওয়া হয়, তাহলে এইরূপ চাওয়ার মূলে এই বিশ্বাস নিহিত থাকে যে, যার কাছে বৃষ্টি চাওয়া হয়েছে সে অলৌকিকভাবে বৃষ্টি বর্ষণের ক্ষমতার অধিকারী। আর এটাই শিরক। কেননা এইরূপ শক্তি যারই আছে বলে বিশ্বাস করা হবে, তাকে-ই ইলাহ বানানো হবে। অথচ কুরআনের ঘোষণানুযায়ী অলৌকিকভাবে কারো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই আছে, অন্য কারো নেই।

৩. নবী-রাসূলগণের মুযিজা প্রকাশের পর্যায়েও আল্লাহতাআলা এ কথাই ঘোষণা করেছেন নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে
وَ مَا كَانَ لِرَسُوْلٍ ا َنْ يَّاْتِىَ بِاٰيَةٍ اِلَّا بِاِذْنِ اللهِ

এবং কোন রাসূলেরই কোন মুযিজা বা নিদর্শন দেখানোর ক্ষমতা বা অধিকার নেই আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত। (সূরা মুমিন : ৭৮)
অতএব প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নিজস্ব ক্ষমতা ও ইচ্ছায় হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা বা অধিকার আছে-একথা বিশ্বাস করা সুস্পষ্টরূপে শিরক।

উপকরণ বা কার্যকারণের সহায়তা গ্রহণ সম্পর্কে আকীদা

উপকরণ বা কার্যকারণের এই জগত আল্লাহতাআলারই সৃষ্টি। এখানে তিনি মানুষকে উপকরণ বা কার্যকারণের বাধ্যবাধকতার মধ্যে জীবনযাপনকারী জীব হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। অতএব মানুষ এ জগতে বেঁচে থাকার জন্য উপকরণ বা কার্যকারণের-বস্তুগত দ্রব্য সামগ্রীর আনুকুল্য ও সহায়তা গ্রহণে স্বাভাবিকভাবেই বাধ্য। অতএব নিছক উপকরণ বা কার্যকারণের সহায়তা গ্রহণ নিশ্চয়ই শিরক হবে না। তবে সেই সাথে যদি এই বিশ্বাস পোষণ করা হয় যে, উপকরণ বা কার্যকারণ সমূহেই নিজস্ব স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শক্তি রয়েছে কোন কাজ ঘটানোর, তাতে আল্লাহর ইচ্ছা বা অনুমতির কোন অপেক্ষা নেই, তাহলে তা অবশ্যই শিরক হবে। যেমন ঘরে আগুন লেগেছে। স্বাভাবিক নিয়মেই আগুনে ঘর জ্বলে-পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। এই জ্বালানোর শক্তি আগুনের নিজস্ব এবং আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই তা জ্বালাবে-এইরূপ ধারণা পোষণ শিরক। অনুরূপভাবে সে আগুন নেভানোর জন্য অবিলম্বে পানি ঢালতে হবে। পানি আগুন নিভিয়ে ফেলবে। কিন্তু যদি মনে করা হয় যে, পানির আগুন নিভানোর শক্তি একান্তই নিজস্ব, তা আগুন নেভাবেই-আল্লাহর অনুমতি না হলেও, তবে তা-ও শিরক হবে।

এখানে তাওহীদী বিশ্বাস হলো, আগুন জ্বালায় আল্লাহর দেয়া দাহিকা শক্তির বলে ও তাঁর অনুমতিক্রমে এবং পানি আগুন নিভায় আল্লাহর দেয়া নির্বাপণ শক্তির বলে ও তার অনুমতিক্রমে। আল্লাহর দেয়া শক্তি ছাড়া আগুন বা পানি-কারোরই কোন শক্তি নেই, কারোরই কিছু করার নেই। সমগ্র প্রাকৃতিক আইন, বস্তু, দ্রব্য-সম্ভার, ঔষধপত্র সব কিছুর ক্ষেত্রেই শিরক ও তাওহীদী আকীদার মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।