প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭ হিজরী, অগ্র-পৌষ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। অধিকন্তু ইসলামের তাওহীদ বিষয়ক ধারণা আমার উপর অতিমাত্রায় কার্যকর বলে মনে হলো। কুরআন ও হাদীসের উপর আমার এলো গভীর আস্থা। কোরআন ও হাদীস যতটা সহজবোধ্য বলে মনে হলো বাইবেল ছিল ততটাই দুর্বোধ্য এবং সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ- গ্রেগ নুয়াকিজ
ইসলামিক ফিউচার এ গ্রেগ নুয়াকিজ এর Road to Islam সম্পর্কে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমরা নিজেদের সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। ইসলামিক ফিউচার Asscmbly of Muslim Youth-এর একটি অঙ্গ। আমরা জানলাম যে, গ্রেগ Washington Report on Middle East-এর সম্পাদক। সৌভাগ্যবশত আমরা তার যোগাযোগের ঠিকানা পেলাম। ১৯৯৫ সালের ৩০ এপ্রিল একটি প্রশ্নমালা সহ গ্রেগ-এর ঠিকানায় চিঠি লিখলাম।
গ্রেগ নুয়াকিজ আমাদের অনুরোধে সাড়া দিলেন এবং চিঠির জবাব দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করলেন। এখানে গ্রেগ-এর প্রশ্নোত্তরগুলো মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার জানার জন্য তুলে ধরলাম । সাথে সাথে তার Road to Islam গল্পটিও পরিবেশন করলাম। গ্রেগ হামদর্দ ইসলামিকস-এ প্রকাশিত ইজতিহাদ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। আমরা তারও সারসংক্ষেপ তুলে ধরলাম। -সম্পাদক
প্রিয় ভাই শহীদ,
৩০ এপ্রিলে লেখা আপনার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আপনি আমার লেখাটি হাতে পেয়েছেন জেনে খুশী হয়েছি। পত্রের জবাব দিতে আমার দেরীর জন্য ক্ষমা করবেন। আমি জরুরী কাজে খুবই ব্যস্ত ছিলাম। আমার লেখার সাথে একটি ছবিও পাঠালাম। আমার মনে হয় আমার দেয়া তথ্যগুলো আপনাকে সাহায্য করবে।
- ১৯৬৬ সালের ২১ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে আমার জন্ম।
- ১৯৮৮ সালে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমি ইতিহাসে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করি। ১৯৯০ সালে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স করি। তখন থেকে আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস শুরু করি এবং ওয়াশিংটন রিপোর্টে কাজ করা আরম্ভ করি।
- আমার মাকে হারাই সাত বছর আগে। আমার পিতা, বোন এবং দাদী টেক্সাসে এখনও বাস করেন। আমি প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান পরিবারে গড়ে উঠি।
- আমি মুসলমান হয়েছি বেশী বেশী জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে। আমার আস্থা হলো, ইসলামই একটা ধর্ম যাতে আমি বিশ্বাস রাখতে পারি। খ্রিস্টান হয়েও আমি অন্যের প্রয়োজনে সাহায্য করতাম এবং অন্যের সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। ইসলামেও এ বিষয়গুলোকে দেখতে পেলাম। ইসলামেই এ বিষয়গুলো অতি স্বচ্ছ ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে চিত্রিত। আমি দেখলাম ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তেই কিছু না কিছুর চর্চা হচ্ছে, অথচ খ্রিস্টান ধর্ম মাত্র রবিবারে চার্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইসলাম প্রকৃতপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। অধিকন্তু, ইসলামের তাওহীদ বিষয়ক ধারণা আমার উপর অতিমাত্রায় কার্যকর বলে মনে হলো। কুরআন ও হাদীস আমার কাছে সহজবোধ্য মনে হলো। আর বাইবেল ছিল অতি দুর্বোধ্য এবং সংশয় ও সন্দেহপূর্ণ।
- ওয়াশিংটন ডিসিস্থ ইসলামিক সেন্টারে আমি ১৯৮৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। শেখ ফাতিহ আল মাদি-এর সামনে আমি কালেমা পাঠ করি। তখন দুজন সাক্ষী ছিল। একজন ছিল ইসলামী একটি দেশের, অন্যজন আমেরিকান নও-মুসলিম। ইসলাম আমার জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। কুরআনই হচ্ছে ইসলামের কেন্দ্রীয় বিষয়। এটি পড়তে ও শুনতে অপূর্ব লাগে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি কিছু আরবি শব্দ বুঝতে পারি এবং প্রকৃত আরবী ভাষা বুঝতে অনেকটা সক্ষম হচ্ছি। বর্তমানে কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ বেরিয়েছে। আমি অবলীলায় এগুলো পড়তে পারছি। কুরআন বিলিয়ন বিলিয়ন লোক দ্বারা পঠিত। যারা কুরআন পাঠ করে তারা অনুধাবন করে যে. আল্লাহ যেন সরাসরি কথা বলছেন এবং তাদের অবস্থা কুরআনের ভাষায় বলে দিচ্ছেন। এটা সত্যিই বিস্ময়কর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন একজন বন্ধু এবং সঙ্গী হিসেবে দেখতে পায়।
আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতের ধর্ম হবে ইসলাম। কারণ, এটিই আল্লাহর পক্ষ হতে চুড়ান্ত রিসালাত। এর সত্যতার বিপক্ষে কোন কিছুই দাঁড়াতে সক্ষম নয়। তবে একথা ভুললে চলবে না যে মুসলমানরা কোন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে না। মুসলিম উম্মাহর ভেতরে এবং বাইরে তাদেরকে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হবে। মুসলমানরা যদি ইসলামকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, নিজেদের শিক্ষিত দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে ইসলামের ভবিষ্যত তখনই কুসুমিত ও বিকশিত হবে।
আমি টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে একটি খ্রিস্টান প্রোটেস্টান্ট পরিবারে বড় হই। একজন শিশু হিসেবে চার্চের গুরুত্ব আমার নিকট ছিল খুবই বেশি। আর এ চার্চই ছিল নৈতিক শিক্ষার উৎস যার দ্বারা ভাল কিংবা মন্দ বিচার করা যেত। কিন্তু চার্চের এ শিক্ষা আমার ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় কোন প্রভাব ফেলতে পারে নি। আমি শুধুমাত্র রবিরারেই চার্চে যেতাম এবং বাকি দিনগুলোতে আমার উপর চার্চের কোন প্রভাব ছিলনা।
আমি কলেজ জীবনে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ইতিহাসের উপর আমার সব সময়ই একটা তীব্র আকর্ষণ ছিল। আমার কোর্সের মধ্যেই প্রাথমিক অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস পড়ার সুযোগ হলো। আমার ধারণা হলো যে, এ কোর্সটি আমার জন্য উপকারীই হবে। কেননা, এ অঞ্চল সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল খুবই কম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বিষয়টি জানার জন্য বিদেশী ভাষা আরবীকে কোর্সের সাথে সংযুক্ত করবো। সময় যতই যাচ্ছিল আমি মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে ততই উৎসাহবোধ করছিলাম। আমি আর বিশ্বের উপর আমার কোর্সের কাজ এবং গবেষণাকে নিশ্চিত করলাম। স্মাতক নেয়ার পর ওয়াশিংটন রিপোর্টের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের উপর দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ করলাম। আমি মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা প্রবাহ বিশেষভাবে অবলোকন করতে লাগলাম। আমি আমার শ্রেণীর কোর্স এবং বিভিন্ন এসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে গিয়ে ইসলামের শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পড়লাম। ইসলাম সম্পর্কে যতই পড়ছিলাম তা ততটাই আমাকে আকৃষ্ট করছিলো। যেহেতু ইসলামের সৌন্দর্য সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না, তাই আমি মুসলিম ও অমুসলিম লেখকদের বই পড়তে শুরু করলাম। বেশ অনেকগুলো বই বা লেখা আমার মনকে নাড়া দিল। তার মধ্যে ইউরোপীয় মুসলিম Charles de Gai Eston-Gi Masterful Islam and Destiny of Mans. ফজলুর রহমানের পর্যালোচনামূলক লেখা Islam and non-muslim, Marshall Hodgson-এর তিন খণ্ডে সমাপ্ত বই The Venture of Islam.
ধর্মের নৈতিক শিক্ষা আমি আমার পিতা-মাতার নিকট হতে শিক্ষা লাভ করেছিলাম। তা ছিল ঈশ্বরে বিশ্বাস, অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা, সততা, ভদ্রতা-নম্রতা এবং সম্মানবোধ ইত্যাদি। হবে ইসলামের যে নতুনত্ব তা হলো, এসব গুণাবলী ও মূল্যবোধগুলো হল পূর্ণাঙ্গ এবং সুপরিকল্পিত। ইসলামের শিক্ষাগুলো হল উন্নত ও ভক্তিপূর্ণ, অন্তর্দর্শী এবং সহজবোধ্য।
আমি এক বছর সময় নিলাম। এ সময়ে মধ্যে ইসলামী শিক্ষা, বিশ্বাস ও ব্যবহারিক বিষয়টি সম্পর্কে আমার জ্ঞানের অপূর্ণতা বুঝার চেষ্টা করলাম।শাহাদাত আমার জীবনের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তাই আমি আমার প্রতিশ্রতি বা অঙ্গীকারের প্রতি আমার সামর্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হচ্ছিলাম। দীর্ঘ তিন বছরের পড়াশুনা, গবেষণা এবং গভীর চিন্তা ভাবনার পর ১৯৮৯ সালে গ্রীষ্মে আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার মধ্যে একটা প্রশ্নই ছিল,কেন আমি কনভার্ট হলাম। এ বিষয়ে ছোট বড় হাজারো কারণ থাকলেও দুটি বিষয়কেই আমি মুসলিম হবার কারণ বলে মনে করি।
প্রথমত, দুনিয়ার মালিক ও বিচারক মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষের কাজকর্মের বিচার করবেন এবং প্রত্যেক নারী পুরুষ তার কর্মের জন্য দায়িত্বশীল হবে- ইসালামের এ বিশ্বাস আমার মনের গভীরে প্রচণ্ড রয়েছে। আমাদেরকে ভাল-মন্দ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং ভাল ও মন্দ বিচারেরও সামর্থ্য দেয়া হয়েছে। ইসলামের মতে, আমাদের প্রতিটি কর্ম ও ইচ্ছার তাৎর্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মমতের মধ্যে নৈতিক বিষয়গুলোর সাদৃশ্য আমি লক্ষ্য করি। কিন্তু অনেক ধর্মীয় প্রশ্ন এবং বিশ্বাসের বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামে যে সন্তোষজনক জবাব খুঁজে পাওয়া যায় তা খ্রিস্টান ধর্মে পাওয়া যায়নি।
যেহেতু আমি মুসলমান হয়েছি তাই আমার বিশ্বাস ও জ্ঞানের গভীরতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমি স্বীকার করি যে, ইসলামী শিক্ষা, চিন্তা এবং পাণ্ডিত্যের সামান্যই মাত্র আমি বুঝতে সক্ষম হয়েছি। আমি দেখছি এখনই ইসলামের উত্তম সময় এবং এটা মুসলিম হবারও উপযুক্ত সময়।
