প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৭, রজব-শাবান ১৪৩৮ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ….’ সংখ্যায়
(যারা এ দুনিয়ায় কোনো কল্যাণকর কাজ করবে
তাদের জন্য পরকালেও মহাকল্যাণ (থাকবে))
(সূরা আনকাবুত : আয়াত-১০
১
একজন মুসলিম নারী, আপনি পশ্চিমা ও প্রাচ্যেরও না
একজন জার্মান নারীর উপদেশ- পশ্চিমাদের আদর্শ এবং তাদের ফ্যাশন অনুকরণ ও অনুসরণ কর না। এই সবকিছুই এক ধরনের ফাঁদ যা আমাদেরকে ক্রমশ আমাদের সম্পদ ব্যয়ে আমাদের ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ইসলামে নারীর জন্য উপযুক্ত পারিবারিক পদ্ধতি-ই উত্তম। কেননা, নারী প্রকৃতিগতভাবেই ঘরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, প্রশ্ন করতে পার কেন? কেননা, মহান প্রশংসিত আল্লাহ তায়ালা পুরুষকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী করে তৈরি করেন, এটা শারীরিক ক্ষমতার কারণেই হয় এবং আল্লাহ তায়ালা নারীকে পুরুষের চেয়ে গভীর অনুভূতি, বেশি আবেগপ্রবণতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। নারীরা পুরুষের মতো ক্ষমতা রাখে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি গাম্ভীর্যপূর্ণ হয়। তাই ঘরই তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ স্থান। নারীরা তাদের স্বামীকে ভালবাসবে এবং সন্তানরা কোনো কারণ ছাড়া তাদের ছেড়ে যাবে না এবং এক সাথে মিলেমিশে বসবাস করবে। নিরানব্বই ভাগ নারীরা ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছায় যতক্ষণ না তারা নিজেদেরকে বিক্রি করে এবং তাদের মনে স্রষ্টার প্রতি ভয় তৈরি না হয়।
পশ্চিমা নারীরা ভালো বেতনের জন্য বাইরে কাজ করে, যার ফলে পুরুষরা নারীর ভূমিকা পালন করে। তাই তারা থালা-বাসন ধৌত করে। বাচ্চাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং মদ পান করে। ইসলামে পুরুষদের স্ত্রীদেরকে ঘরের কাজে সাহায্য করার কথা বলেছে এবং উৎসাহিত করেছে। কিন্তু তাদেরকে এই জাতীয় পরগাছার হওয়ার কথা বলেনি।
‘তুমি সুন্দর হও তাহলে তোমার কাছে সেরা পৃথিবী সুন্দর হবে।’
(আমি তোমাদের জন্য সহজ পদ্ধতিগুলোর সুযোগ করে দিব) (সূরা আল-আ’লা : আয়াত-৮)
২
তোমার দুঃখকে ভুলে যাও এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখ
যদি তোমার সমস্যা তুমি সমাধান করতে পার, তাহলে তুমি তোমার নিজেকে ভিন্ন কোনো কাজে মনোযোগী কর। দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় নিজেকে ব্যস্ত রাখ। (সূরা আহযাব : আয়াত-৪)
আমাদেরকে ধারণা করতে দাও যে, সমস্যাটা কি সন্তানের অসুস্থতা নাকি বাবা-মার জন্য সঠিক ঔষধ দেয়া, যাতে সে তার বাকি সময় ভালো কোনো লাভজনক কাজে ব্যয় করতে পারে।
যখন কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যার মুখামুখি হও, এটা তোমার জন্য স্মরণীয় যে, এর চেয়ে কঠিন সমস্যা যা তুমি অতীতে অতিক্রম করে এসেছ। বিশেষ করে যেই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছ তার চেয়ে বড় সমস্যা। স্মরণ কর আল্লাহ কিভাবে তোমাকে সাহায্য করেছে ও সমাধান করে। আর এখন আরো স্মরণ কর যে, এটা একটা আত্মবিশ্বাসের হাসি ছাড়া আর কিছুই আনবে না। যদি এটা মনে রাখতে পার তাহলে দেখবে এটা বর্তমান সমস্যাটা পুরাতন সমস্যার মতোই; এটাও আল্লাহর রহমতে শেষ হয়ে যাবে এবং সমাধান হয়ে যাবে।
তোমার সমস্যার একটা ইতিবাচক সমাধান প্রত্যাশা কর। নিশ্চয় এটা যেন ইতিবাচকের চেয়ে বেশি নেতিবাচক হয়ে না যায়। ইবনে আল জোয়ারী এই জ্ঞানী কথা বলেন- ‘যে কেউই যখন দুর্যোগে অথবা বিপদের সাথে যুদ্ধ করে, তখন তার বুঝা উচিত এটা তার প্রকৃত অবস্থার চেয়ে আরো বেশি কষ্টকর এবং এটার পুরস্কার কল্পনা কর। তাকে এটা বুঝতে দাও যে, সে যে বিপদে পড়েছে এটা তার চেয়ে বেশি ভালো।
এমনিভাবে সে বুঝতে পারবে যে, এটা একটা মহান দয়া যা বিপদের চেয়ে বেশি উত্তম এবং আশা রাখবে যে, এটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। যদি এটা তীব্র বিপদ না হয় তাহলে কেউ মুক্তির আশা করে না।’ একজন জ্ঞানী মানুষ বলেন-
‘আমি যা বলিনি তার জন্য কখনো অনুতাপ করিনি; বরং আমি যা বলেছি, মাঝে মাঝে তার জন্য অনুতপ্ত থাকি।’
(হে আমাদের মালিক! তুমি আমাদের পথের দিশা দিয়েছ, তুমি আমাদের মনকে বাঁকা করে দিয়ো না)
(সূরা আল-ইমরান : আয়াত-৮)
৩
সুখী হওয়ার কৌশল
লোভ-লালসা মারাত্মক ক্ষতিকর এবং যার ঔষধ হচ্ছে-
১. অর্থ ব্যয় যে অনেক অর্থ ব্যয় করে সে কখনো তুষ্ট হবে না; বরং সে লোভ লালসায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অর্থ মানুষ শান্তির জন্য ব্যয় করে। তাই বলা হয় : ‘ভালো ব্যবস্থাপনা অর্ধেক সম্পদ রক্ষা করে।’
২. ভবিষ্যতের ব্যাপারে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হয়ো না এবং অল্পতে তোমার আকাক্সক্ষা পূরণে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা কর। বিশ্বাস রাখ তোমার ভাগ্যে যা লিপিবদ্ধ হয়েছে তা তোমার কাছে আসবে।
৩. সমস্ত ক্ষমতাধর আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ তায়ালা বলেন- অত:পর যখন তারা তাদের (ইদ্দতের) সে নির্ধারিত সময় (-র শেষে) উপনীত হয়, তখন তাদের হয় সম্মানজনক পন্থায় (বিয়ে বন্ধনে) রেখে দেবে, না হয় সম্মানের সাথে তাদেরকে আলাদা করে দেবে এবং (উভয় অবস্থায়ই) তোমাদের মধ্য থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ লোককে তোমরা সাক্ষী বানিয়ে রাখবে। (সাক্ষীদেরও বল), তোমরা শুধু আল্লাহর জন্যই (এ) সাক্ষ্য দান করবে; যারা আল্লাহ তায়ালা ও শেষ বিচার দিনের ওপর ইমান আনে, তাদের সবাইকে এর দ্বারা উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (সংকট থেকে বের হয়ে আসার) একটা পথ তৈরি করে দেন।
এবং তিনি তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন যার (উৎস) সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। কেননা, আল্লাহ তায়ালা তার নিজের কাজ পূর্ণ করেই নেন; আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি জিনিসের জন্যই একটি পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন। (সূরা মুহাম্মদ : আয়াত-২-৩)
ভেবে দেখো, কোন জিনিস তোমার জন্য শান্তির পুরস্কার বয়ে আনবে এবং কোন জিনিস তোমার জন্য অবমাননাকর লোভ লালসার সৃষ্টি করবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন এবং তার সাহাবীদের জীবন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা কর, তারা সকলেই শান্ত এবং বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন এবং তারা কিভাবে সঠিক কাজ এবং আমল তোমাদের জীবনের বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ কর।
তাদের দিকে তাকাও যারা পার্থিব ক্ষেত্রে তোমার চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
‘জ্ঞানী মানুষ জ্ঞানগর্ব মতামত থেকে লাভ খোঁজে : তারা কখনো হতাশ হয় না অথবা এর চেষ্টা এবং চিন্তা ছেড়ে দেয় না।’
এতে সন্দেহ নেই, আল্লাহ তায়ালা বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ বান্দাকে ভালবাসেন না।
(সূরা আল-হাজ্জ : আয়াত-৩৮)
৪
যখন অন্যদের সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়
তখন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী কর।
বিশ্বস্ততার সাথে ভালো কাজ করলে তা পৃথিবীতেই জীবনে ভালো পুরস্কার বয়ে আনবে। এটা কোনো ব্যাপারই না যে, জীবন চাকচিক্য এবং ধন সম্পদে ভরে যাবে। কিন্তু ভালো জীবন অর্জন করা এই সকল জিনিসের চেয়ে অনেক উত্তম।
সম্পদ ছাড়া জীবনে অনেক কিছু আছে যা জীবন অনেক সুন্দর করে, এমনকি জীবনে একটি জিনিস থাকাই যথেষ্ট। যেমন-আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখা, তার প্রতি আস্থা রাখা, তার শান্তিতে এবং তত্ত্বাবধানে নিশ্চিত হওয়া, ভালো স্বাস্থ্য, সুখ, শান্তি, অনুভব করা এবং অন্যদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উপভোগ করা; ভালো কাজের আনন্দ এবং তাদের প্রতিক্রিয়া মানুষের জীবনকে আরো সচেতন করে তুলে।
সম্পদ শুধুমাত্র একটি উপকরণ যার অল্পই যথেষ্ট। তাই আমাদের মনে আল্লাহর রহমতে আরো খাঁটি আরো উদার, আরো টেকসই জিনিসের প্রতি মনোনিবেশ করা উচতি।
‘একটি প্রতিষ্ঠিত আইন যা একজন মহান মানুষ তাদের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মহত্বের উত্তরাধিকারী হয়।’
(এরা এমন (বিদ্রোহী) ছিল, যখন এদের বলা হতো, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তখন তারা অহংকারে ফেটে পড়ত।)
(সূরা আস-সাফফাত : আয়াত-৩৫)
৫
যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই
আমি বিশ্বব্যাপী ডজন খানেক ধনী এবং মহৎ মানুষের জীবনী অধ্যয়ন করেছি, আল্লাহর প্রতি যাদের বিশ্বাস নেই। আমি আবিষ্কার করেছি তাদের জীবন দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে শেষ হয়েছে। তারা এখন কোথায়? তাদের অর্জিত ধন সম্পদ কোথায়? তাদের নির্মিত প্রাসাদ-বাংলো কোথায়? এই সব শেষ হয়ে গেছে, কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে, কেউ কেউ নিহত হয়েছে, কেউ বন্দী হয়েছে, বাকিরা গ্রেফতার হয়েছে। তাদের পাপ, অপরাধ এবং বোকামীর বিচার হচ্ছে। তারা সবচেয়ে দুঃখী মানুষে পরিণত হয়েছিল। তারা যখন ভেবেছিলো যে, তাদের সম্পদ সবকিছু কিনতে পারে। সুখ, ভালবাসা, স্বাস্থ্য যৌবন টাকা দ্বারা কেনা যায় না। হ্যাঁ, তারা কল্পনার সুখ কিনতে পারে, মিথ্যা, ভালবাসা কিনতে পারে কিন্তু সব সম্পদ দিয়ে কিনতে পারা যায় না। যা ভালবাসা এবং আনন্দ সৃষ্টি করে।
যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তার চেয়ে সুখী আছে কেউ নেই। কেননা, তার কাছে স্রষ্টার নূর আছে, তারা নিজেকে পরীক্ষা করতে পারে এবং তারা তাই করে যা আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেছেন এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে। কুরআনে বর্ণিত পথের কথা নিম্নরূপ-
(তোমাদের) পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে ব্যক্তিই কোনো নেক কাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে হবে যথার্থ মুমিন। তাহলে অবশ্যই তাকে আমি দুনিয়ার বুকে পবিত্র জীবন যাপন করাব এবং আখিরাতের জীবনেও তাদের (দুনিয়ার)
জীবনের কার্যক্রমের অবশ্যই উত্তম বিনিময় দান করব। (সূরা আন-নাহল : আয়াত-৯৭)
‘সে সুখী হয় না যে সুখী হতে চায় না’
