প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ছোট্ট বন্ধুরা,
তোমরা সকলেই জ্ঞান, আমাদের প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম বললে বা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হয়- ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।’ এবং একথাও নিশ্চয় শুনেছ, নবীজীর কোন সাহাবীর নাম শুনলে বা বললে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হয়- ‘রাযিয়াল্লাহু আনহু।’ এর অর্থ, আল্লাহ তাঁর প্রতি খুশী।
ও হ্যাঁ! সাহাবী কাকে বলে তাতো বলা হয়নি।
তাহলে শোন! ইসলাম গ্রহণ করার পর যেসব ভাগ্যমান মানুষ আমাদের মহানবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বচক্ষে দেখেছেন, তাঁর কাছে আসার খোশ নসীব লাভ করেছেন এবং ঈমান নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁরাই হলেন সাহাবী।
তবে মনে রেখ, তখনকার দিনে ইসলাম গ্রহণ করা কিন্তু খুব সহজ কথা ছিল না। কারণ, সেকালের মক্কার লোকেরা ছিল বেজায় পাষণ্ড। তারা দিন-দুপুরে ডাকাতি করতো। কথায় কথায় ঝগড়া বাধিয়ে খুন করতো কত্তো মানুষ। বাজারে যেমন গণ্ডায় গণ্ডায় মাছ বিক্রি হয় তেমনি হাটে-বাজারে মানুষ বিক্রি হতো। ওরা দাস-দাসী! তাই কথায় কথায় মার খেত ওরা মনিবদের হাতে। কারও ঘরে কন্যা সন্তান হলে তার নাকি অপমান হতো। তাই চাঁদের মতো ফুটফুটে মা-মণিদেরকে জীবন্ত কবর দিয়ে ফেলতো ওরা। আহা, কী-যে চিৎকার করে আব্বু আব্বু করে ডাকতো ওরা! মায়ামাখা কচিকণ্ঠে! কিন্তু পাষাণদের মন গলতো না।
এর চাইতেও ভয়ংকর বিষয় কি ছিল জানো? পবিত্র কাবা ঘরে ওরা হাতের তৈরি মূর্তি সাজিয়ে পূজা করতো। তাও কি একটি- দুটি! তিনশ’ ষাটটি! দেখ, কত্তো বড় বেঈমানী, কত্তো বড় সাহস! আল্লাহ’র ঘরে মূর্তি! তোমরাই বল, এত অবিচার এত অন্যায় কি মেনে নেয়া যায়? যায় না!
আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেন। আর অমনি ক্ষেপে ওঠল তাঁর বিরুদ্ধে সকলেই! ক্ষেপবেই তো! চামচিকারা কি আলো পছন্দ করে, বল! অতঃপর শুরু হলো নবীজীর প্রতি সে-কি অত্যাচার!
একটি ঘটনা বলি!
একবার আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায পড়তে দাঁড়িয়েছেন। পবিত্র কা’বা ঘরের সামনে। পাশেই বেঈমান-মুশরিকদের একটি জটলা! তারা যখন দেখল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রাণ খুলে আল্লাহর ইবাদত করছেন তখন তাদের গায়ে জ্বালা ধরে গেল। কী, আমাদের দেব-দেবীদের এই অপমান! আমাদের সামনেই ‘এক’ আল্লাহর ইবাদত!? দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি! ছুটে গেল এক হতভাগা। উট জবাই করে তার নাড়ি ভুঁড়ি যেখানে ফেলে রাখে সেখানে। গিয়ে ইয়াবড় একটি উটের ভুঁড়ি নিয়ে ছুটে এলো নবীজীর দিকে।
প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সিজদায়। তিনি প্রাণ খুলে তাঁর প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছেন মাটিতে কপাল রেখে। সেই অভাগা বেঈমান কি করল জানো! উটের ভুড়িটি এনে নবীজীর মাথায় চাপিয়ে দিলো। অসম্ভব ভারে নবীজীর দম বন্ধপ্রায়। প্রাণ তাঁর যায় যায়। চোখ দুটো যেন বেরিয়ে পড়বে। তিনি কোনভাবেই মাথা ওঠাতে পারছেন না। খবর পেয়ে দৌঁড়ে এলেন নবীজীর আদরের দুলালী ফাতিমা (রা.)! মাথার উপর থেকে টেনে সরালেন উটের ভুঁড়ি। এবং বেঈমানদেরকে বেশ কিছু তিতে কথাও বললেন।
আচ্ছা, তোমরাই বল! আমাদের নবীজী কী অপরাধ করেছিলেন সেদিন! ওদের হাতে বানানো পাথরের তৈরি মূর্তিকে সিজদা করেননি এই তো। আর ওদেরকে নিষেধ করেছেন মন্দ কাজ করতে; অন্যায়ভাবে কাউকে অত্যাচার করতে নিষেধ করেছেন! তাই তাঁর প্রতি এই জুলুম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই ভয়ংকর দুর্দিনে যাঁরা এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন; তাঁকে বিশ্বাস করেছেন; জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে আগলে রেখেছেন; পদে পদে নির্যাতিত হয়েছেন; অত্যাচারে বাপ-দাদার বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন; এমনকি নবীজীর কথায় পবিত্র ইসলামের জন্যে জীবন দিয়েছেন; শহীদ হয়েছেন- তোমরাই বল, আল্লাহ কি তাঁদের প্রতি খুশী না হয়ে পারেন? পারেন না। তাই তিনি পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন- ‘রাযিয়াল্লাহ আনহুম ওয়া রাযু আনহু’- তিনি তাঁদের প্রতি খুশী; তাঁরাও তাঁর প্রতি খুশী!
আচ্ছা, একবার ভেবে দেখতো! সেদিন যদি আল্লাহর রহমতে সাহাবীগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে নবীজীকে গ্রহণ না করতেন; জীবনের মায়া করে ঘরে বসে থাকতেন তাহলে কেমন হতো! কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো ইসলাম? আমরা কিভাবে সন্ধান পেতাম বেহেশতের? পেতাম না। কেউ পেতাম না। আমাদের প্রতি এত যাদের অনুগ্রহ তাঁদের নাম শুনলে যদি একটু ‘রাযিয়াল্লাহু আনহু’ বলে দু’আও না করি তাহলে খুব বেশি নিমকহারামী হয়ে যাবে না?
* * * * *
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দুর্দিনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে এসে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন তবু ছেড়ে যাননি নবীজীকে, তাঁদের-ই অন্যতম হযরত হামযা (রা.)! সম্পর্কে তিনি নবীজীর চাচা! তিনি নবীজীর দুধভাইও! বয়স ছিল দু’জনের খুবই কাছাকাছি। বেড়ে ওঠেছেন এক সাথে। শৈশব-কৈশোর গেছে পাশাপাশি। তাই তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুধু চাচা কিংবা দুধ ভাই-ই ছিলেন না- ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। দু’জনই দু’জনকে জানতেন। খুব ভালো করেই জানতেন। পরস্পরে ভাবও ছিল বেশ। তাই মক্কার বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত নারী হযরত খাদিজা (রা.) আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সততা পবিত্র স্বভাব মধুময় ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যখন বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন নবীজী বিষয়টি তাঁর চাচাদেরকে বলেন। চাচারা শুনে তো ভীষণ খুশি! বিশেষ করে হযরত হামযা (রা.)!
এই খুশির সংবাদ শুনে হযরত হামযা (রা.) সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন। নবীজীকে সঙ্গে করে চলে গেলেন হযরত খাদিজা (রা.)-এর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। খাদিজা (রা.)-এর বাবা খুআইলিদ হযরত হামযা (রা.)-এর এই প্রস্তাব শুনে তো আনন্দে আটখানা! রাজী এবং সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে!
[ চলবে ]
