প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
১২০ খৃস্টানদের সাথে যুদ্ধ
১. মুসলমানদের সাথে খৃষ্ট-সংঘাতের ইতিহাস অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের সম্মুখীন হয়েছে। কখনো শান্তিচুক্তি, কখনো যুদ্ধ, কখনো সংঘাত আবার কখনো আপোষ। সম্প্রতি খৃস্টানদের সাথে মুসলমানদের বাহ্যিক স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করলেও অদূর ভবিষ্যতে এক মহাযুদ্ধ অপেক্ষা করছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একে বিশ্বযুদ্ধ বলে ব্যক্ত করেছেন। সে যুদ্ধে মুসলমানদেরকে আল্লাহ মহা-বিজয় দান করবেন। মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের এই যুদ্ধ কিয়ামাতের আরেকটি আলামত।
২. আউফ বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ অতঃপর তোমাদের মাঝে ও রোমানদের মাঝে একটি চুক্তি সম্পাদিত হবে। কিন্তু তারা উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করে আশিটি ঝান্ডার অধীনে যুদ্ধ করবে। প্রত্যেক ঝান্ডার অধীনে বারো হাজার সৈন্য। (বুখারী ৩১৭৬)
৩. নাফি বিন্ উত্বাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমরা আরব দ্বীপের সাথে যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে জয় দিবেন। তোমরা পারস্যের সাথে যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদেরকে জয় দিবেন। তোমরা রোমের সাথে যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদেরকে জয় দিবেন। অতঃপর তোমরা দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদেরকে জয় দিবেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ নাফি বললোঃ হে জাবির! আমাদের ধারণা, দাজ্জাল বেরুবে না যতক্ষণ না রোম পরাজিত হয়। ( মুসলিম ২৯০০)
৪. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ তোমরা রোমক (খৃস্টানদের) সাথে এক শান্তিচুক্তি করবে। অতঃপর তোমরা এবং খৃষ্ট সম্প্রদায় মিলে পেছনের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে। সেখানে বিজয়ী হয়ে তোমরা প্রচুর যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদের অধিকারী হবে। গনিমত বন্টন শেষে প্রত্যাবর্তন কালে উঁচু টিলাবিশিষ্ট উপত্যাকায় এসে পৌঁছুলে- খৃস্টানদের একজন তখন ক্রোশ উঁচু করে- ক্রোশের বিজয় হয়েছে-বলতে থাকবে। এক মুসলমান তখন রাগন্বিত হয়ে ক্রোশকে ভেঙ্গে দেবে। খৃষ্ট-সম্প্রদায় তখন চুক্তি ভঙ্গ করে মহাযুদ্ধের জন্য সমবেত হয়ে যাবে।”
অপর বর্ণনায়- “মুসলমান-ও তখন অস্ত্র বের করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। মুসলমানদের ঐ দলটিকে আল্লাহ শাহাদতের মর্যাদায় ভূষিত করবেন।” ( আবূ দাউদ)
৫. পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছেঃ আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “কিয়ামাত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না রোমক (খৃষ্ট) সম্প্রদায় আমাক (মতান্তরে দাবেক) প্রান্তরে (শামের প্রসিদ্ধ হালব এর সন্নিকটে একটি স্থান, সেখানে-ই মহাযুদ্ধটি সংঘটিত হবে। এসে একত্রিত হবে। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দামেষ্ক শহর থেকে একদল শ্রেষ্ঠ মুসলমান বের হবে। উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে রোমক সম্প্রদায় বলবে- তোমরা সরে যাও। ধর্মত্যাগীদেরকে আমরা হত্যা করতে এসেছি। (বুঝা গেল, এর পূর্বে মুসলিম -খৃষ্ট আরো কতিপয় যুদ্ধ সংঘটিত হবে।
মুসলমান সেখানে বিজয়ী হয়ে। কিছু খৃস্টানকে বন্দি করে নিয়ে আসবে। পরবর্তীতে বন্দি খৃস্টানরা মুসলমান হয়ে মুজাহিদদের কাতারে শামিল হয়ে যাবে) মুসলমান তখন বলবে- (দ্বীনী) ভাইদেরকে আমরা কস্মিনকালেও তোমাদের হাতে তুলে দেব না। ফলে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। এক-তৃতীয়াংশ (মুসলমান) পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাবে, এদের তওবা আল্লাহ্ কখনো কবুল করবেন না। এক-তৃতীয়াংশ নিহত হয়ে যাবে, আল্লাহ্র কাছে তারা শ্রেষ্ঠ শহীদের মর্যাদা পাবেন। অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশকে আল্লাহ মহাবিজয় দান করবেন, কখনোই ফেতনা তাদের গ্রাস করতে পারবে না। সামনে এগিয়ে তারা কনস্টান্টিনোপল বিজয় করবে। তরবারিগুলো বৃক্ষের সাথে ঝুলিয়ে যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ বন্টন করতে থাকবে, হঠাৎ শয়তান তাদের মাঝে ঘোষণা করবে- “ দাজ্জাল তোমাদের পরিবারগুলোকে ধাওয়া করেছে-।” ঘোষণাটি মিথ্যে হলেও মুসলমানগণ -সকল যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ ফেলে দিয়ে স্বদেশ অভিমুখে রওয়ানা হবে। তারা যখন শামে ফিরে আসবে, তখন ঠিক-ই দাজ্জাল বের হয়ে আসবে।”অপর বর্ণনায়- “দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মুসলমান সারিবদ্ধ হতে থাকবে। হঠাৎ ফজরের নামাযের ইকামত – কালে ঈসা বিন মারিয়ম আসমান থেকে অবতরণ করবেন।” (মুসলিম)
৬. রোমানদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে দেয়া হলোঃ
ইয়াসীর বিন্ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- একদা কুফায় অগ্নিবায়ু দেখা দিলে জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন্ মাস্‘উদ (রাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস্‘উদ (রাঃ) কিয়ামাত তো এসেই গেলো। তখনো আব্দুল্লাহ্ বিন মাস্‘উদ (রাঃ) হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। একথা শুনে তিনি সোজা হয়ে বসে বললেনঃ কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না মিরাস অবন্টিত থেকে যায়। যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ পেয়েও মানুষ অসুন্তুষ্ট হয়। অতঃপর তিনি সিরিয়ার দিকে ইশারা করে বললেনঃ শত্রু একত্রিত হবে এবং মুসলমানরাও একত্রিত হবে। বর্ণনাকারী বলেনঃ আপনি কি রোমনদের কথা বলছেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। উক্ত যুদ্ধের সময় অস্ত্রের ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনি বহু দূর থেকে শুনা যাবে। তখন মুসলমানরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত এমন একটি সেনা দল তৈরি করবে। যারা জয়যুক্ত না হয়ে ঘরে ফিরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করবে। যুদ্ধ চলতে থাকবে। আর ইতিমধ্যে রাত্রি এসে যাবে। তখন এরাও নিজ তাঁবুুতে ফিরে আসবে এবং ওরাও নিজ তাঁবুতে ফিরে যাবে। পরিস্থিতি এমন হবে যে, তখনো কেউ কারোর উপর জয়যুক্ত হতে পারেনি। এ দিকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত সেনা দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন মুসলমানরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত এমন আরেকটি সেনা দল তৈরি করবে। যারা জয়যুক্ত না হয়ে ঘরে ফিরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করবে। যুদ্ধ চলতে থাকবে।
আর ইতিমধ্যে রাত্রি এসে যাবে। তখন এরাও নিজ তাঁবুতে ফিরে আসবে এবং ওরাও নিজ তাঁবুতে ফিরে যাবে। পরিস্থিতি এমন হবে যে,তখনো কেউ কারোর উপর জয়যুক্ত হতে পারেনি। এ দিকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত সেনা দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে । তখন মুসলমানরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আরেকটি সেনা দল তৈরি করবে। যারা জয়যুক্ত না হয়ে ঘবে ফিরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করবে। যুদ্ধ চলতে থাকবে । আর ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তখন এরাও নিজ তাঁবুতে ফিরে আসবে এবং ওরাও নিজ তাঁবুতে ফিরে যাবে। পরিস্থিতি এমন হবে যে,তখনো কেউ কারোর উপর জয়যুক্ত হতে পারেনি। এ দিকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত সেনা দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। যখন চতুর্থ দিন হবে তখন বাকি সব মুসলমান শত্রুর উপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
তবে তারা এ যুদ্ধেও পরাজিত হবে। তারা এমন এক যুদ্ধে মেতে উঠবে যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি কোন পাখি তাদেরকে অতিক্রম করতে না করতেই সে মরে গিয়ে নিচে পড়বে। তখন একই বংশের একশত জন গণে দেখা যাবে তাদের মধ্যে একজনই বেঁচে আছে। তখন যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ নিয়ে খুশি হওয়ারই বা কি থাকবে এবং কোন উত্তরাধিকার সম্পদই বা বন্টন করা হবে। এমতাবস্থায় তারা আরো এক কঠিন বিপদের কথা শুনতে পাবে। তারা শুনতে পাবে, দাজ্জাল তাদের স্ত্রী-সন্তানদের উপর এক ভীষণ তান্ডবলীলা চালাচ্ছে। তখন তারা সবকিছু ফেলে রেখেই ওদিকে দৌড়াতে থাকবে। সর্ব প্রথম তারা তাদের মধ্য থেকে দশ জন অগ্রগামী অশ্বরোহী পাঠাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমি তাদের নাম এবং তাদের বাপ-দাদার নামও জানি। এমনকি তাদের ঘোড়ার রংও। তারাই হবে সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী। (মুসলিম ২৮৯৯)
৭. যুদ্ধকালে মুসলিম বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি থাকবে আল-গুতা প্রান্তরে আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “বিশ্বযুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনী শামের প্রসিদ্ধ শহর দামেষ্কের আল-গুতা প্রান্তরে অবস্থান করবে।” (আবু দাউ/আউন ১১/৪০৬)
১২১. কনসট্যান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তামুল) বিজয়
১. কনসট্যান্টিনোপল তথা ইস্তামুল বিজয় কিয়ামাতের আরেকটি আলামত যা দাজ্জাল বেরুবার পূর্বে এবং রোমানদের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পরেই অর্জিত হবে। তাতে কোন যুদ্ধই হবে না।
২. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ একপ্রান্ত জলে, অপর প্রান্ত স্থলে- এমন শহরের কথা তোমরা শুনেছ? সবাই বলল..হ্যাঁ..! নবীজী বললেন-কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে বনী ইসহাকের সত্তর হাজার মুসলমান সেখানে যুদ্ধ করবে। তীর-তরবারি ব্যবহার করবে না; বরং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার-” ধ্বনির সাথে সাথে শহরের এক প্রান্ত ধ্বসে পড়বে (ছাউর বিন ইয়াযিদ বলেন- ঠিক স্মরণে নেই আমার, সম্ভবত স্থলভাগের শহরটি প্রথমে ধ্বসে পড়বে)। দ্বিতীয়বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার-” ধ্বনির দিলে অপরপ্রান্ত ধ্বসে পড়বে। তৃতীয়বার “লা ইলহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার-” উচ্চারণ করলে শহরের প্রধান ফটক উন্মুক্ত হয়ে যাবে । মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টনে ব্যস্ত থাকবে, এমন সময় বিপদের ধ্বনি ভেসে আসবে- “দাজ্জাল বের হয়ে গেছে। এ সংবাদ শুনা মাত্রই তারা সবকিছু মাটিতে ফেলে রেখে চলে আসবে।” (মুসলিম,২৯২০)
৩. মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায়-বনী ইসহাক- শব্দ এসেছে। তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে -বনী ইসমাইল। কারণ,হাদিসে আরব মুসলিম বাহিনী উদ্দেশ্য। শহর বলতে এখান কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান তুরষ্কের রাজধানী ইস্তামুল) বুঝানো হয়েছে। বিশ্বযুদ্ধে যে সকল মুসলিম রোমকদের সাথে যুদ্ধ করবে, তারাই পরে গিয়ে শহরটি বিজয় করবে।
১২২. ত্যাজ্য ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টনের সুযোগ থাকবে না
শেষ জমানায় খৃস্টানদের সাথে মুসলমানদের অধিক সংঘাতের ফলে এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে ত্যাজ্য ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টনে সুুযোগ থাকবে না। কথাটি বলার সময় তিনি শামের দিকে ইশারা করেছিলেন বিস্তারিত বিবরণ পূর্বোক্ত হাদিসে গত হয়েছে।
