প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
৬১. শুধু পরিচিতদেরকেই সালাম দেয়া
১. শুধু পরিচিতজনকেই সালাম দেয়া কিয়ামতের আরেকটি আলামাত। আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : কিয়ামাতের অন্যতম আলামাত হচ্ছে একে অপরকে সালাম দিবে শুধুমাত্র পরিচয়ের ভিত্তিতেই। (আহ্মাদ্ ৫/৩২৬)
২. অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কিয়ামাতের পূর্বক্ষণ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদেরকেই সালাম দেয়া হবে। (আহ্মাদ্ ৫/৩৩৩)
৩. মুসলমানদের পারস্পারিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব – বোধ বজায়ের লক্ষ্যে আল্লাহ্ পাক সালামের বিধান চালু করেছেন। ছোট- বড়কে সালাম দেবে, ধনী- গরীবকে সালাম দেবে, আরব -অনারবকে সালাম দেবে, সাদা- কালোকে সালাম দেবে। পরিচিত অপরিচিত সকলেই সালাম দিবে।
৪. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : পরিপূর্ন মুমিন না হওয়া পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। পরস্পরের প্রতি পূর্ণ ভালবাসা ও সম্প্রীতি পোষণ না করা পর্যন্ত তোমরা মুমিনও হতে পারবে না। কিভাবে পারস্পারিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে সেই রহস্য কি তোমাদের বলব?! বেশী বেশী সালাম দাও! আগে-ভাগে সালাম দাও। (মুসলিম)
৫. ব্যক্তি বিশেষে সালাম প্রদান কিংবা শুধু পরিচিত বুঝে সালাম প্রদান -কিয়ামাতের অন্যতম নিদর্শন। অথচ ইসলামী বিধান হচ্ছে, পরিচিত অপরিচিত সকলকেই সালাম দিতে হবে।
৬. জনৈক সাহাবী বলেন- ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাতকালে এক ব্যক্তি বলল- আস সালামু আলাইকুম হে আব্দুল্লাহ! সালাম শুনে ইবনে মাসউদ (রাঃ) কে বলে উঠলেন- নবীজী সত্য-ই বলেছেন। আমি নবীজীকে বলতে শুনেছি- কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে- মানুষ মসজিদে গমন করবে, কিন্তু (তাহিয়্যাতুল মসজিদের) দুই রাকাত নামায আদায় করবে না এবং পরিচিত ছাড়া কাউকে সালাম দিবে না। ( সহীহ ইবন খুযাইমা ২/২৮৩-২৮৪)
৭. বুখারী -মুসলিম বর্ণনায়- এক ব্যক্তি নবীজীকে – ইসলামের কোন কাজটি সবচেয়ে ভালো- জিজ্ঞেস করলে নবীজী বলতে লাগলেন-“অসহায়কে খাদ্যদান এবং পরিচিত অপরিচিত সবাইকে সালাম প্রদান।”
৬২. তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায না পড়া
১. সহীহ ইবনে খুযাইমাতে বর্ণিত উপরিউক্ত হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মসজিদে গমনের পর (বসার পূর্বে) দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায আদায় না করা কিয়ামাতের অন্যতম আলামত।
২. অন্য বর্ণনায় রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি মসজিদ অতিক্রম করবে ; অথচ তাতে তার নামায খানা আদায় করে নিবে না। (মায্মাউয্যাওয়ায়িদ্ ৭/৩২৯)
৩. অথচ যে কোন সময় মসজিদে ঢুকলে সর্ব প্রথম দু রাকায়াত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে নিতে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে তখন সে যেন দুরাক্আত নামায আদায় না করে না বসে। (বুখারী ৪৪৪, ১১৬৩;মুসলিম ৭১৪)
৬৩. বুড়োদের কৃত্রিমভাব যৌবন দেখানো
১. বুড়োদের সাদা চুলকে কালো করে কৃত্রিমভাবে যৌবন দেখানো কিয়ামাতের আরেকটি আলামত। আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : শেষ যুগে এমন কিছু লোক বেরুবে যারা সাদা চুলকে কালো করবে। মনে হবে যেন কবুতরের পেট। তারা জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। (আহমাদ ৪/১৫৬ আবূ দাউদ/আউন ১১/২৬৬)
২. বর্তমান যুগে কিছু সংখ্যক লোক তো তাদের চেহারাকে বাস্তবেই কবুতরের পেট বানিয়ে ফেলে। চার দিক থেকে কামিয়ে শুধু থুতনির উপরই কিছু দাঁড়ি রেখে দেয় এবং তা কালো রঙ্গে রঙ্গীন করে। তখন থুতনিটাকে হুবহু কবুতরের পেটের মতোই দেখা যাবে।
৩. চুল বা দাঁড়ি সাদা হয়ে গেলে তাতে কালো রঙ ছাড়া অন্য যে কোন রঙ ব্যবহার করা যায়। বরং তা করাই শ্রেয়। কারণ, তাতে করে ইহুদি ও খ্রিস্টানের সাথে এক ধরনের অমিল সৃষ্টি হয় যা শরীয়তের একান্ত কাম্য।
৪. জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন : ইহুদি-খ্রিস্টানরা চুল-দাঁড়ি কালার করে না। অতএব তোমরা তাদের উল্টোটা তথা দাঁড়ি-চুলগুলোকে কালার করবে। (মুসলিম ২১০৩)
৬৪. সম্পদ উপার্জনে হালাল- হারাম তোয়াক্কা না করা
১. আল্লাহর ভয় যখন অন্তর থেকে লোপ পায়, কাজ কর্মেও তখন ধর্মীয় অনুভুতি হ্রাস পায়। ধর্মীয় অনুভুতি হ্রাস পাওয়ার ফলে শুরুতে সন্দেহে.. এরপর হারামে লিপ্ত হয়ে যায়। ফলশ্র“তিতে ধন সম্পদ উপার্জনে আর হালাল-হারাম বাছ-বিচার থাকে না। মুসলিম সমাজে আজকাল এ নিদর্শন প্রতিনিয়ত বাস্তবায়িত হচ্ছে।
২. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ সম্পদ উপার্জনে হালাল-হারামের তোয়াক্কা করবে না। (বুখারী)
৩. হালাল-হারাম যে কোন উপায়েই হোক- টাকা পয়সা আমাকে কামাতে-ই হবে- বর্তমান কালে এটি সকলের একমাত্র জীবন লক্ষ পরিণত হয়েছে। এ কারণেই আজ হালাল-হারামের বাঁধন ছিড়ে গেছে। মানুষ অবৈধ চাকুরী এবং হারাম ব্যবসায় লিপ্ত হয়ে গেছে। সিগারেট ব্যবসা,মদের ব্যবসা, মহিলাদের শর্ট ড্রেস বিক্রি, সুদি কারবারি, কু-কর্মীদের জন্য বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ। এগুলো-ই আজকাল অভিজাত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অথচ আল্লাহ পাক বলেছেন, তোমরা উত্তম বস্তু ভক্ষণ কর।
৪. আল্লাহ পাক হচ্ছেন পবিত্র,পবিত্র বস্ত ছাড়া তিনি কিছুই গ্রহণ করবেন না। সুদ ও হারামের টাকায় কেনা খাদ্য খেয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হলে জাহান্নাম-ই তার একমাত্র ঠিকানা হবে -এতে কোন সন্দেহ নেই।
৫. অপরদিকে যারা হারাম এবং সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন, তারা আজ অপরিচিত। বরং সুদ গ্রহণে অস্বীকার করতঃ হালাল পথে চলার কারণে হয়ত আজ তার চাকুরীটি-ও খোয়া গেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত কাজক্রর্ম থেকে বেঁচে থাকল.সে তার দ্বীন ও ঈমানকে বাঁচিয়ে নিল। পক্ষান্তরে যে সন্দেহযুক্ত কাজক্রর্মে লিপ্ত হল, সে হারামে লিপ্ত হয়ে গেল।(বুখারী -মুসলিম) আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তওফীক দান করুন!!
৬৫. পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি হবে লুকা বিন লুকা
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- কিয়ামাত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না পৃথিবীর সবচে সুখী ব্যক্তি হবে – লুকা বিন লুকা। (তাবারানী)
আরবীতে দুশ্চরিত্র ব্যক্তিকে লুকা বলা হয়। নির্বোধ ও গন্ডমূর্খ অর্থ বুঝানোর জন্য এর ব্যবহার বেশি হয়। এ কারণেই দুশ্চরিত্রা, খারাপ ও নষ্টা মহিলার ক্ষেত্রে -ও লুকা- এর প্রযোজ্য হয়।
শেষ জমানায় এ রকম দুশ্চরিত্র ব্যক্তি- গাড়ি-বাড়ি, ধন সম্পদ, মর্যাদা এবং প্রভাব -প্রতিপত্তিতে সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি গণ্য হবে। হালাল-হারাম যাচাই না করে সব ধরনের সোর্স থেকে উপার্জন করবে।
