প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭ হিজরী, অগ্র-পৌষ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় অনাবৃত করার পক্ষে যেমন কুরআনের নির্দেশনার ব্যাখ্যা, হাদীসের বক্তব্য ও সাহাবীগণের মতামত পাওয়া যায়, পদযুগলের বিষয়ে তা পাওয়া যায় না। বরং কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য নির্দেশ করে যে, পদযুগল আবৃতব্য অঙ্গ। এজন্য অনেক সাহাবী, তাবিয়ী ও পরবর্তী ফকীহ মুখমণ্ডল ও করতলদ্বয় অনাবৃত রাখার অনুমতি প্রদান করলেও কেউই পদযুগল অনাবৃত রাখার অনুমতি প্রদান করেননি। কেবলমাত্র ইমাম আবু হানীফা (রাহ.) থেকে অপ্রসিদ্ধ সূত্রে একটি মত বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি পদযুগলকেও প্রকাশযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। তার এ মতটি মাযহাবে প্রসিদ্ধ নয় এবং মাযহাবের মূল গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হয়নি। এই একটি অপ্রসিদ্ধ মত ছাড়া মুসলিম উম্মাহর ইমাম ও ফকীহগণ একমত যে, পদযুগল আবৃতব্য অঙ্গ।
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, সূরা নূরের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকামের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। এ নির্দেশ অত্যন্ত সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, মুসলিম মহিলাকে পদযুগল আবৃত করতে হবে।
সাহাবী, তাবিয়ীগণ এবং পরবর্তী মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে পায়ে পরিধানের গোপন সৌন্দর্য বা গোপন অলঙ্কার বলতে, পায়ের তোড়া, মল বা এ জাতীয় অলঙ্কার (Anklet) বুঝানো হয়েছে। আমরা জানি যে এ জাতীয় অলঙ্কার পায়ের একদম নিচের অংশে গোড়ালির সাথেই থাকে। এ আয়াত থেকে আমরা জানছি যে, এগুলি গোপন অলঙ্কার। এগুলি অনাবৃত করা বৈধ নয়। কুরআনের এ আয়াতে সর্বত্রই অলঙ্কার বা সৌন্দর্য বলতে অলঙ্কার ও অলঙ্কার পরিধানের স্থান বুঝানো হয়েছে। এভাবে আমরা বুঝতে পারছি যে, পায়ের মল বা তোড়া এবং তোড়ার স্থানটি দূরাত্মীয় ও অনাত্মীয় পুরুষদের সামনে আবৃত রাখা কুরআনের নির্দেশ অনুসারে মুসলিম রমণীর উপর ফরয ইবাদত। শুধু তাই নয, মল বা তোড়ার শব্দ প্রকাশ পায় এমনভাবে পদক্ষেপ করাও তার জন্য হারাম।
হাদীস শরীফেও এ বিষয়ে বারংবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোপূর্বে প্রথম অধ্যায়ে টাখনু আবৃত ও অনাবৃত করা প্রসঙ্গে আমরা এ বিষয়কে একটি হাদীস উল্লেখ করেছি। উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদেরকে কাপড়ের ঝুল পায়ের নলা বা গোড়ালির নিচে এক হাত ঝুলিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন চলাচল, কর্ম বা সালাতের মধ্যে পায়ের পাতা অনাবৃত না হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ থেকে মুসলিম রমণীগণ এভাবেই পোশাক পরিধান করতেন। তাদের পোশাকের নিম্নাংশ যেহেতু সর্বদা মাটি স্পর্শ করে থাকত, সেহেতু তারা তা নাপাক হওয়ার ভয় পেতেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন মহিলা সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি তাদেরকে পোশাকের নিম্নপ্রান্ত গোড়ালি পর্যন্তও উঁচু করতে অনুমতি দেন নি। বরং নাপাকির মধ্যেই কাপড় ভূলুণ্ঠিত করে হা্টঁতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং পরবর্তী পাক মাটি পূর্বের নাপাকি দূর করবে বলে উল্লেখ করেছেন।
এক মহিলা নবী-পত্নী উম্মু সালামা (রা.) কে বলেন, আমি আমার কাপড়ের নিম্নাংশ মাটিতে ঝুলিয়ে পরিধান করি এবং নোংরা-নাপাক স্থান দিয়েও হাঁটি। উম্মু সালামা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: পরের পাক মাটি এ নাপাকি পাক করে দেবে। হাদীসটির সনদ সহীহ। (আবু দাউদ, আস-সুনান ১/১০৪; আলবানী, জিলবাব, পৃ. ৮১-৮২)
হে আল্লাহর রাসূল, মসজিদে আসতে আমাদের পথটি নোংরা-নাপাক। তাহলে বৃষ্টি হলে আমরা কী করব? তিনি বলেন, এ রাস্তার পরে কি আর কোনো পবিত্রতর বা অধিকতর পরিচ্ছন্ন রাস্তা নেই? আমি বললাম, হ্যাঁ, তা আছে। তখন তিনি বলেন, তাহলে ঐটির বদলে এটি (অর্থাৎ নাপাক রাস্তা থেকে কাপড়ে যে নাপাকি লাগবে পরবর্তী ভাল রাস্তার মাটিতে ঘষে তা পবিত্র হয়ে যাবে।) হাদীসটির সনদ সহীহ। (আবু দাউদ, আস-সুনান ১/১০৪, আলবানী, জিলবাব, পৃ. ৮১-৮২)
(পোশাক, পর্দা ও দেহসজ্জা, ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর)
