প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
(খ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত দিবস
বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ইন্তিকাল করেন। (বুখারী, আস-সীহ ১/২৬২, ৪/১৬১৬; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩১৫; আবু নুআইম ইসপাহানী, আল-মুসনাদ আল-মুসতাখরাজ আলা সহীহ মুসলিম ২/৪৩-৪৪।) কিন্তু এ সোমবারটি কোন্ মাসের কোন্ তারিখ ছিল তা কোনো হাদীসে বলা হয়নি। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রামাদান মাসের ১১ তারিখে ইন্তিকাল করেন। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১২৯।) এ একক বর্ণনাটি ছাড়া মুসলিম উম্মাহর সকল ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে ইন্তিকাল করেন। কিন্তু কোন্ তারিখে তিনি ইন্তিকাল করেছেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
বুখারী-মুসলিম সংকলিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায় হজে ৯ই যুলহাজ ছিল শুক্রবার। (বুখারী, সহীহ ১/২৫, ৪/১৬০০, ১৬৮৩, ৬/২৬৫৩; মুসলিম, সহীহ ৪/২৩১২-২৩১৩।) এ থেকে আমরা জানতে পারি যে, সে বছর যুলহাজ মাসের ১ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। আমরা জানি যে, বিদায় হজ থেকে ফিরে তিনি যুলহাজ মাসের বাকি দিনগুলি এবং মুহাররাম ও সফর মাস মদীনায় অবস্থান করেন এবং রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তিকাল করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিদায় হজের এ দিনের পরে ৮০ বা ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। এরপর রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে তিনি ইন্তিকাল করেন। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১৩০।)
ওফাতের তারিখ সম্পর্কে দ্বিতীয় হিজরীর তাবিয়ী ঐতিহাসিকগণ এবং পরবর্তী ঐতিহাসিকগণের ৪টি মত রয়েছে: ১ রবিউল আউয়াল, ২ রবিউল আউয়াল, ১২ রবিউল আউয়াল ও ১৩ রবিউল আউয়াল। (প্রাগুক্ত ৮/১২৯।)
সাধারণভাবে পরবর্তী কালে ১২ তারিখের মতটিই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু এখানে একটি কঠিন সমস্যা রয়েছে। আমরা জানি যে, আরবী মাস ৩০ বা ২৯ দিন হয় এবং সাধারণত কখনোই পরপর তিনটি মাস ৩০ বা ২৯ দিনের হয় না। উপরের হাদীস থেকে আমরা জেনেছি যে, যুলহাজ মাস শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার। আর বৃহস্পতিবার ১ যুলহাজ হলে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ কোনোভাবেই সোমবার হতে পারে না।
যুলহাজ, মুহাররাম ও সফর তিনটি মাসই ৩০ দিনে ধরলে ১ রবিউল আউয়াল হয় বুধবার। দু’টি ৩০ ও একটি ২৯ ধরলে ১ রবিউল আউয়াল হয় মঙ্গলবার। দু’টি ২৯ ও একটি ৩০ ধরলে ১ রবিউল আউয়াল হয় সোমবার। আর তিনটি মাসই ২৯ দিন ধরলে ১ রবিউল আউয়াল হয় রবিবার। আর কোনো হিসাবেই ১২ তারিখ সোমবার হয় না।
এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য কেউ কেউ ৩ তারিখের কথা বলেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, তিনটি মাসই ৩০ দিনের ছিল এবং মদীনায় একদিন পরে চাঁদ দেখা গিয়েছিল। দুটি ব্যাখ্যাই দূরবর্তী। (ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ৮/১২৯-১৩০।)
দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা সুলাইমান ইবনু তারখান আত-তাইমী (৪৬-১৪৩ হি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতার শুরু হয় ২২ সফর শনিবার। ১০ দিন অসুস্থতার পর ২ রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি ইন্তিকাল করেন।’ (প্রাগুক্ত ৮/১২৯।)
তার এ মতানুসারে সে বছরে যুলহাজ্জ, মুহাররাম ও সফর তিনটি মাসই ২৯ দিন ছিল, যা সাধারণত খুবই কম ঘটে। এ জন্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক ও গবেষক ১লা রবিউল আউয়ালের মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে আল্লামা সুহাইলী, ইবনু হাজার প্রমুখ গবেষক মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ২ তারিখের মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। তিনটি কারণে তারা এ মতটি গ্রহণ করেছেন। প্রথম, তাবিয়ীগণের যুগ থেকে সহীহ সনদে কথাটি পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয়, এ মতটি বিদায় হজের পরে তার ৯০ বা ৯১ দিন জীবিত থাকার বর্ণনাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তৃতীয়, যারা ১২ বলেছেন তাদের কথার একটি দূরবতর্ িব্যাখ্যা দেওয়া যায় যে, আরবীতে কে বা ‘মাসের দুই’-কে ‘দশের দুই’ (১২) পড়ার একটি সম্ভাবনা থাকে। কেউ হয়ত ২-কে ১২ পড়েছিলেন ও লিখেছিলেন এবঙ অন্যরা তার অনুসরণ করেছেন। (প্রাগুক্ত ৮/১২৯-১৩০।)
(গ) রবিউল আউয়াল বিষয়ক ভিত্তিহীন কথাবার্তা
উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম বা ওফাতের মাস হিসাবে রবিউল আউয়াল মাসের কোনো উল্লেখ হাদীস শরীফে নেই। এ মাসের কোনো বিশেষ ফযীলত বা বিশেষ আমল কোনো কিছুই হাদীসে বর্ণিত হয়নি।
এ বিষয়ক মিথ্যা গল্প কাহিনীর মধ্যে রয়েছে: ‘এ মাসের ১২ তারিখে বুজুর্গ তাবিয়ী’গণ হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রূহের মাগফিরাতের জন্য ২০ রাকাত নফল নামায পড়িতেন। এ নামায দুই দুই রাকাতের নিয়তে আদায় করিতেন এবং প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পরে ১১ বার করিয়া সূরা ইখলাছ পড়িতেন। নামায শেষে আল্লাহর হাবীবের প্রতি সাওয়াব রেছানী করিতে। তাহারা ইহার বরকতে খাবের মাধ্যমে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দর্শন লাভ করিতেন এবং দোজাহানের খায়ের ও বরকত লাভ করিতেন। অন্য রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, কোন মু’মিন ব্যক্তি নিম্নের দরূদ শরীফ এ মাসের যে কোন তারিখে এশার নামাযর পরে ১১২৫ বার পাঠ করিলে আল্লাহর রহমতে সে ব্যক্তি হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দর্শন লাভ করিবে।….’ (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৬-১৭।)
এরূপ আরো অনেক ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে দেখা যায়। (অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃ. ৩০১-৩০২।) এগুলো সবই বানোয়াট কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের পরবর্তী তিন যুগ, সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীগণের মধ্যে এ মাসটির কোনো পরিচিতিই ছিল না। এ মাসটি যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম মাস সে কথাটিই তখনো প্রসিদ্ধি লাভ করে নি।
৪০০ হিজরীর দিকে সর্বপ্রথম মিসরের ফাতেমীয় শিয়া শাসকগণ ্ মোসে ‘মীরাদ’ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম দিবস পালনের প্রচলন করে। ৬০০ হিজরীতে ইরাকের ইরবিল শহরে ৮ ও ১২ রবিউল আউয়াল ‘মীলাদ’ বা ‘ঈদ মীলাদুন্নবী’ নামে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম উদযাপন শুরু হয়। অপরদিকে ভারত ও অন্যান্য দেশে ১২ রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত উপলক্ষ্যে ‘ফাতেহা;’ বা ‘ফাতেহায়ে দোয়াজদহম’ উদযাপন শুরু হয়। এ বিষয়ক সকল তথ্য বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থে।
৪. রবিউস সানী মাস
রবিউস সানী বা রবিউল আখির মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য, ফযীলত বা এ মাসের কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, দোয়া, যিকর বা বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর পরে, ৫৬১ হিজরী সালের রবিউস সানী মাসের ১০ তারিখে আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.) ইন্তিকাল করেন। আমাদের দেশে অনেকে এ উপলক্ষ্যে ১১ রবিউস সানী গেয়ারভী শরীফ বা ফাতেহায়ে ইয়াযদহম উদযাপন করেন।
স্বভাবতই এর সাথে হাদীসের কোনোরূপ সম্পর্ক নেই। এমনকি জন্ম বা মৃত্যু উদযাপন করা বা জন্ম তারিখ বা মৃত্যু তারিখ উপলক্ষ্যে দোয়া খায়ের বা সাওয়াব রেসানী করার কোনো নির্দেশনা, প্রচলন বা উৎসাহ কোনো হাদীসে নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁর ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী অনেক আত্মীয় ও অনেক সাহাবী ইন্তেকাল করেছেন, যারা সকলেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম ওলীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি কখনো কারো মৃত্যুর পরের বছরে, বা পরবর্তী কোনো সময়ে মৃত্যুর দিনে বা অন্য কোনো সময়ে কোনো ফাতেহা বা কোনো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে তাঁর কন্যা ফাতিমা, জামাতা আলী, দৌহিত্র হাসান-হুসাইন, উম্মুল মুমিনীনগণ, খলীফায়ে রাশিদগণ, অন্যান্য সাহাবীগণ, তাবিয়ী-তাবি-তাবিয়ীগণ কেউ কখনো তাঁর ওফাতের দিনে বা অন্য কোনো সময়ে কোনোরূপ ফাতেহা, দোয়া বা কোনো অনুষ্ঠান করেন নি। অনুরূপভাবে কোনো সাহাবী, তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ী, চার ইমাম, তাদের ছাত্রগণ কেউ কখনো এরূপ ফাতিহা বা অনুষ্ঠান করেন নি।
রবিউস সানী মাসের ফযীলত, আমল ইত্যাদি নামে যা কিছু প্রচলিত রয়েছে সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমন “রবিউস-সানী মাসের প্রথম তারিখে রাত্রিবেলা চার রাকয়া’ত নফল নামায আদায় করিতে হয়। উহার প্রতি রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পরে সূরা ইখলাছ পড়িতে হয়। এই নামায আদায়কারীর আমল নামায় ৯০ হাজার বৎসরের সাওয়াব লিখা হইবে এবং ৯০ হাজার বৎসরের গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইবে। (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৭-১৮) এরূপ আরো অনেক আজগুবি মিথ্যা কথা প্রচলিত বিভিন্ন পুস্তকে দেখা যায়। (মুফতী ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৭-১৮; অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, পৃ.-৩০২)
৫. জমাদিউল আউয়াল মাস
জমাদিউল আউয়াল (জুমাদা আল-উলা) মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য ফযীলত বা এ মাসের কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, দোয়া, যিকর বা বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমন- “রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ এ মাসের প্রথম তারিখে দুই রাকয়াতের নিয়তে মোট ২০ রাকায়া’ত নামায আদায় করিতেন এবং ইহার প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পরে একবার করিয়া সূরা ইখলাছ পাঠ করিতেন। নামাযের পরে নিম্নের দরূদ শরীফ ১০০ বার পাঠ করিতেন। এই নামাযীর আমলনামায় অসংখ্য নেকী লিখা হইবে এবং তাহার সমস্ত নেক নিয়ত পূর্ণ করা হইবে। …কোন ব্যক্তি এই মাসের প্রথম তারিখে দিনের বেলা দুই রাকয়াতের নিয়তে মোট ৮ রাকয়াত নামায আদায় করিলে এ জাতীয় অনেক আজগুবি, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা আমাদের দেশে প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযীলত’ ও এই ধরনের পুস্তকাদিতে পাওয়া যায়।
৬. জমাদিউস সানী মাস
জমাদিউস সানী বা জমাদিউল আখির (জুমাদা আল-আখেরা) মাসের কোনোরূপ বৈশিষ্ট্য, ফযীলত বা এই মাসের কোনো বিশেষ কোনো আমল হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। যেমন- ‘জমাদিউস সানী মাসের পহেলা তারিখে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবীগণ দুই রাকয়াতের নিয়তে মোট ১২ রাকয়াত নামায আদায় করিতেন। ইহার প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পরে ১১ বার করিয়া সূরা ইখলাছ পড়িতেন। আবার কেহ কেহ সূরা ইখলাছের পরে ৩ বার আয়াতুল কুরসী পাঠ করিতেন। এই নামাযে অসংখ্য নেকী লাভ হয়।… (মুফতী ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৮; অধ্যাপিকা দুলাল, নেক কানুন, পৃ.-৩০৩) এ সবই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।
৭. রজব মাস
রজব মাসকে নিয়ে যত বেশি মিথ্যা হাদীস তৈরি করা হয়েছে, তত বেশি আর কোনো মাসকে নিয়ে করা হয়নি। সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানী, জমাদিউল আওয়াল ও জমাদিউস সানী এ ৫ মাসের ফযীলত বা খাস ইবাদত বিষয়ক যা কিছু বানোয়াট কথাবার্তা তা মূলত গত কয়েক শত বছর যাবত ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রচলিত হয়েছে। ৫ম/৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত মাউযূ হাদীস বা ফযীলতের বইগুলোতেও এ সকল মাসের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ সকল যুগে যে সকল নেককার সরলপ্রাণ বুযুর্গ ফযীলত ও আমলের বিষয়ে সত্য-মিথ্যা সকল কথাই জমা করে লিখতেন তাদের বই-পুস্তকেও এ মাসগুলোর কোনো প্রকারের উল্লেখ নেই। তাঁরা মূলত রজব মাস দিয়েই তাদের আলোচনা শুরু করতেন এবং মুর্হারাম মাস দিয়ে শেষ করতেন।
আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে, রজব মাস ইসলামী শরীয়তের ‘হারাম’ অর্থাৎ ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘সম্মানিত’ মাসগুলির অন্যতম। জাহিলী যুগ থেকেই আরবরা ‘ইবরাহীম (আ)- এর শরীয়ত’ অনুসারে এ মাসগুলোর সম্মান করত। তবে ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার ও রসম-রেওয়াজ প্রবেশ করে। জাহিলী যুগে আরবরা এ মাসকে বিশেষ ভাবে সম্মান করত। এ মাসে তারা ‘আতীরাহ’ নামে এক প্রকারের ‘কুরবানী’ করত এবং উৎসব করত। হাদীস শরীফে তা নিষেধ করা হয়েছে। ¬(বুখারী, আস-সহঃীহ ৫/২০৮৩; মুসলিম, আস-সহীহ, ৩/১৫৬৪; ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯২-১৯৪।)
‘হারাম’ মাস হিসাবে সাধারণ মর্যাদা ছাড়া ‘রজব’ মাসের মর্যাদায় কোনো সহীহ হাদীসে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয় নি। এ মাসের কোনোরূপ মর্যাদা,এ মাসের কোনো দিনে বা রাতে কোনো বিশেষ সালাত, সিয়াম, যির্ক, দোয়া, তিলাওয়াত বা কোনো বিশেষ ইবাদতের বিশেষ কোনো ফযীলত আছে এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনোরূপ কোনো হাদীস সহীহ বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। পরবর্তী যুগের তাবিয়ী, তাবি-তাবিয়ীগণ থেকে সামান্য কিছু কথা পাওয়া যায়। কিন্তু এ বিষয়ে অনেক জাল কথা প্রচলিত। যেহেতু আমাদের দেশে সাধারণভাবে ২৭ রজব ছাড়া অন্য কোনো দিবস বা রাত্রি কেন্দ্রিক জাল হাদীসগুলো তেমন প্রসিদ্ধ নয়, সেহেতু ২৭ রজবের বিষয়ে কিছু বিস্তারিত আলোচনা ও বাকি বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনার ইচ্ছা করছি। মহান আল্লাহর দরবারে তাওফীক প্রার্থনা করছি।
(ক) সাধারণভাবে রজব মাসের মর্যাদা
সাধারণভাবে ‘রজব’ মাসের মর্যাদা, এ মাসে কী কী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এবং এ মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে বা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারের সালাত, সিয়াম, দান, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত করলে কী অকল্পনীয় পরিমাণে সওয়াব বা পুরস্কার পাওয়া যাবে তার বর্ণনায় অনেক জাল হাদীস বানানো হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ‘বার চাঁদের ফযীলত’ ও আমল-ওযীফা বিষয়ক বইগুলোতে এগুলোর সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়।
যেমন, অন্য মাসের উপর রজবের মর্যাদা তেমনি, যেমন সাধারণ মানুষের কথার উপরে কুরআনের মর্যাদা…। এ মাসে নূহ (আ) ও তাঁর সহযাত্রীগণ নৌকায় আরোহণ করেন…। এ মাসেই নৌকা পানিতে ভেসেছিল…। এ মাসেই রক্ষা পেয়েছিল। এ মাসেই আদমের তাওবা কবুল হয়। ইউনূস (আ)-এর জাতির তাওবা কবুল করা হয়। এ মাসেই ইবরাহীম (আ) ও ঈসা (আ) এর জন্ম। এ মাসেই মূসার জন্য সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়।….
এ মাসেই প্রথম তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। এ মাসের ২৭ তারিখে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন।… এ মাসের ২৭ তারিখে তিনি মি’রাজে গমন করেন। … এ মাসে সালাত, সিয়াম, দান-সাদকা, যিক্র, দরুদ, দোয়া ইত্যাদি নেক আমল করলে তার সাওয়াব বৃদ্ধি পায় বা বহুগুণ বেড়ে যায়…। ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা ও জাল হাদীস। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৯; ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; মোল্লা কারী, আল-আসরার পৃ. ১৬৬; আল-মাসনূ, পৃ. ৯৭; লাখনবী, আল-আসার, পৃ. ৫৮-৯০।)
পূর্ববর্তী অনেক বুযুর্গের আমল ও ফাযাইল বিষয়ক গ্রন্থে এগুলোর সমাবেশ রয়েছে। তবে আমাদের সমাজের সাধারণ ধার্মিক মুসলিমদের মধ্যে এগুলোর প্রচলন কম। এজন্য এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা বর্জন করছি।
(খ) রজব মাসের সালাত
রজব মাসে সাধারণভাবে এবং রজব মাসের ১ তারিখ, ১ম শুক্রবার, ৩, ৪, ৫ তারিখে, ১৫ তারিখ, ২৭ তারিখ, শেষ দিন ও অন্যান্য বিশেষ দিনে বা রাতে বিশেষ সালাত আদায়ের বিশেষ পদ্ধতি ও সেগুলোর অভাবনীয় পুরস্কারের ফিরিস্তি দিয়ে অনেক জাল হাদীস প্রচারিত হয়েছে। পূর্ববর্তী যুগের আমল, ওযীফা ও ফাযাইল বিষয়ক পুস্তকাদিতে এবং আমাদের দেশের বার চান্দের ফযীলত, আমল-ওযীফা ও অন্যান্য পুস্তকে এগুলোর কিছু কথা পাওয়া যায়। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলোর প্রচলন কম। এজন্য এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করছি না। মুহাদ্দিসগণ এক্ষেত্রে যে মূলনীতি উল্লেখ করেছেন তা বলেই শেষ করছি। আল্লামা ইবনু রাজাব, ইবনু হাজার, সুয়ূতী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে বলেছেন, রজব মাসে বিশেষ কোনো সালাত বা রজব মাসের কোনো দিনে বা রাতে কোনো সময়ে কোনো সালাত আদায় করলে বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে এ মর্মে একটি হাদীসও গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল ও বানোয়াট। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৪; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; মোল্লাকারী, আল-আসরার, পৃ. ২৩৮; আল-মাসনূ, পৃ. ২০৮; আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার, পৃ. ৫৮-৯০, ১১১-১১৩।)
(গ) রজব মাসের দান, যিকর ইত্যাদি
রজব মাসের দান, যিক্র, দরূদ, দোয়া ইত্যাদি নেক আমলের বিশেষ কোনো সাওয়াব হবে বা সাধরণ সাওয়াব বৃদ্ধি পাবে এ মর্মে যা কিছু বর্ণিত ও প্রচলিত হয়েছে সবই বাতিল ও ভিত্তিহীন। (ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৭; ইবনু হাজার আসকালানী, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৯-৮০; আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার, পৃ. ৫৮-৯০।)
(ঘ) রজব মাসের সিয়াম
সবচেয়ে বেশি জাল হাদীস প্রচলিত হয়েছে রজব মাসের সিয়াম পালনের বিষয়ে। বিভিন্নভাবে এ মাসে সিয়াম পালনের উৎসাহ দিয়ে জালিয়াতগণ হাদীস জাল করেছে। কোনো কোনো জাল হাদীসে সাধারণভাবে রজব মাসে সিয়াম পালন করলে কত অভাবনীয় সাওয়াব তা বলা হয়েছে। কোনোটিতে রজব মাসের নির্ধারিত কিছু দিনের সিয়াম পালনের বিভিন্ন বানোয়াট সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। কোনোটিতে রজব মাসে ১ টি সিয়ামের কি সাওয়াব, ২টি সিয়ামের কি সাওয়াব, ৩টির কি সাওয়াব… ৩০টি সিয়ামের কত সাওয়াব ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, রজব মাসের সিয়ামের বিশেষ সওয়াব বা রজব মাসের বিশেষ কোনো দিনে সিয়াম পালনের উৎসাহ জ্ঞাপক সকল হাদীসই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো কথাই নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয় নি। (ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃ. ৯৬; ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৫-১৯৭; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ৩৯২-৩৩০; আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার, ৫৮-৭৯; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৫৩৯-৫৪১; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৫৬৭।)
(ঙ) লাইলাতুর রাগাইব
রজব মাস বিষয়ক জাল হাদীসের মধ্যে অন্যতম হলো ‘লাইলাতুর রাগাইব’ ও সে রাত্রির বিশেষ সালাত বিষয়ক জাল হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে এ রাত্রির নামকরণ, ফযীলত, এ রাত্রির সালাতের ফযীলত, রাক’আত সংখ্যা, সূরা কিরাআত, পদ্ধতি সব কিছুই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা। কিন্তু বিষয়টি অনেক মুসলিম দেশে ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে।
প্রথমে কিছু জালিয়াত এ রাত্রিটির নামকরণ ও এ বিষয়ক কিছু আজগুবি গল্প বানায়। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি আকর্ষণীয় ওয়াযে পরিণত হয়। জাল হাদীসের একটি বৈশিষ্ট্য, তা সাধারণ মানুষের চিত্তাকর্ষক হয় এবং কোনো একটি জাল হাদীস একবার ‘বাজার পেলে’ তখন অন্যান্য জালিয়াতও বিভিন্ন সনদ বানিয়ে তা বলতে থাকে। এভাবে অনেক জাল হাদীস সমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। সালাতুর রাগাইব বিষয়ক হাদীসগুলোও সেরূপ। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পরে এই জাল হাদীসগুলো প্রচারিত ও প্রসিদ্ধি লাভ করলে সাধারণ মুসল্লীগণ অনেক দেশে উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ঘটা করে সালাতুর রাগাইব পালন করতে শুরু করেন। এ সকল সমাজে ‘লাইলাতুল বারাত’ -এর মতই উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়।
এ বানোয়াট সালাতটি আমাদের দেশে তেমন প্রসিদ্ধি লাভ করে নি। এজন্য এ বিষয়ে বিস্তুারিত আলোচনা করছি না। এর সার সংক্ষেপ হলো রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রি হলো ‘লাইলাতুর রাগাইব’ বা আশা আকাঙক্ষা পূরণের রাত’। রজবের প্রথম বৃহস্পতিবারে সিয়াম পালন করে, বৃহস্পতিবার দিবাগত শুক্রবারের রাত্রিতে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে ১২ রাক’আত সালাত নির্ধারিত সূরা, আয়াতও দোয়া-দরূদ দিয়ে আদায় করবে।…তাহলে এ ব্যক্তি এত এত …পুরস্কার লাভ করবে। … এর সাথে আরো অনেক কল্প কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে এ সকল জাল হাদীসে।
এ সকল হাদীসের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে মুহাদ্দিসগণ সেগুলির সূত্র ও উৎস নিরীক্ষা করে এর জালিয়াতির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর সকল মুহাদ্দিস একমত যে, ‘লাইলাতুর রাগাইব’ ও সালাতুর রাগাইব বিষয়ক’ বিষয়ক সকল কথা মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওদূ’আত ২/৪৬-৪৮; ইবনু রাজাব, লাতাইফ ১/১৯৪-১৯৫; ইবনু হাজার, তাবয়ীনুল আজাব, পৃ. ৫৪; সুয়ূতী আল-লাআলী ২/৫৫-৫৬;ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/৩০৩,৩০৬, ২/৯০-৯১; মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ. ৩২৮; আল-মাসনূ, পৃ. ২০৮; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৫৩৯-৫৪১; আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার, পৃ ৬২-৭৭।)
(চ) রজব মাসের ২৭ তারিখ
বর্তমানে আমাদের সমাজে ২৭শে রজব মি’রাজ-এর রাত বলেই প্রসিদ্ধ। সে হিসেবেই আমাদের দেশের মুসলিমগণ এ দিনটি উদযাপন করে থাকেন। কিন্তু এ প্রসিদ্ধির আগেও রজব মাসের ২৭ তারিখ বিষয়ক আরো অনেক কথা প্রচলিত হয়েছিল হয়েছিল এবং এই তারিখের দিবসে ও রাতে ইবাদত বন্দেগির বিষয়ে অনেক জাল কথা প্রচলিত হয়েছিল। প্রথমে আমরা ‘লাইলাতুল মি’রাজ’ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। এরপর এ দিন সম্পর্কে প্রচলিত বানোয়াট ও জাল হাদীসগুলো আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।
১. লাইলাতুল মি’রাজ
ইসরা ও মি’রাজের ঘটনা বিভিন্নভাবে কুরআন কারীমে ও অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রায় অর্ধশত সাহাবী থেকে মি’রাজের ঘটনার বিভিন্ন দিক ছোট বা বড় আকারে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মি’রাজের তারিখ সম্পর্কে একটি কথাও বর্ণিত হয় নি। সাহাবীগণ কখনো তাঁকে তারিখ সম্পর্কে প্রশ্নও করেছেন বলে জানা যায় না। পরবর্তী যুগের তাবিয়ীদেরও একটি অবস্থা; তাঁরা এ সকল হাদীস সাহাবীদের থেকে শিখছেন, কিন্ত তাঁরা তারিখ নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না। কারণ, তাঁদের কাছে তারিখের বিষয়টির কোনো মূল্য ছিল না, এসকল হাদীসের শিক্ষা গ্রহণই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। ফলে তারিখের বিষয়ে পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মি’রাজ একবার না একাধিবার সংঘঠিত হয়েছে, কোন বছর হয়েছে, কোন্ মাসে হয়েছে, কোন তারিখে হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে এবং প্রায় ২০টি মত রয়েছে। মাসের ক্ষেত্রে অনেকেই বলেছেন রবিউল আউয়াল মাসের ২৭ তারিখ। কেউ বলেছেন রবিউস সানী মাসে, কেউ বলেছেন রজব মাসে, কেউ বলেছেন যিলকাদ মাসে এবং কেউ বলেছেন, যুলহাজ্জ মাসে। তারিখের বিষয়ে আরো অনেক মতবিরোধ আছে।
দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে তাবিয়ী ঐতিহাসিকগণ মি’রাজের ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন নি। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ মি’রাজের তারিখ বিষয়ক মতভেদ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনু কাসীর (৭৭৪ হি.), ইবুন হাজার আসকালানী (৮৫২ হি.), আহমাদ বিন মুহাম্মাদগ কাসতালানী (৯২৩হি.), মুহাম্মাদ বিন ইউসূফ শামী (৯৪২হি.), আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪হি) ও অন্যান্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। (দেখুন: ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৪৭০-৪৮০, শামী, সুবুলুল হুদা (সরাহ) )
এত মতবিরোধের কারণ হাদীস শরীফে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয় নি এবং সাহাবীগণও কিছু বলেন নি। তাবি-তাবিয়ীদের যুগে তারিখ নিয়ে কথা শুরু হয়, কিন্তু কেউই সঠিক সমাধান না দিতে পারায় তাঁদের যুগ ও পরবর্তী যুগে এত মতবিরোধ হয়। এ মতবিরোধ থেকে আমরা বুঝাতে পারি যে, কয়েক শতক আগেও ‘শবে মি’রাজ’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো রাত নির্দিষ্ট ছিল না।
এভাবে আমরা দেখছি যে, রজব মাসের ২৭ তারিখে মি’রাজ হয়েছিল, বা এ তারিখটি ‘লাইলাতুল মি’রাজ’, এই কথাটি তাবিয়ী ও পরবর্তী যুগের ঐতিহাসিকগণের অনেক মতের একটি মত মাত্র। এ কথাটি হাদীসে দ্বারা প্রমাণিত নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ তারিখে মি’রাজ হওয়া সম্পর্কে কোনো কিছুই সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই ঐতিহাসিকগণের মতামত অথবা বানোয়াট কথাবার্তা আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি করেছি যে, কোনো কোনো জাল হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রজব মাসের ২৭ তারিখে রাসূলুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন, নবয়ত লাভ করেন…ইত্যাদি। এগুলোও বাতিলও মিথ্যা কথা।
