প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৯ হিজরী,অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৩.(এই ব্যাপারটি বিবেচ্য যে) নবী একটি কথা নিজের একজন স্ত্রীর নিকট অতি গোপনীয়তা সহকারে বলিয়াছিলেন, পরে সেই গোপন কথা প্রকাশ করিয়াছিল এবং আল্লাহতা’আলা নবীকে এই (গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেওয়ায়) বিষয়টি জানাইয়া দিলেন, তখন নবী (তাঁহার স্ত্রীকে) এই বিষয়ে কতকটা সতর্ক করিয়াছিলেন, আর কতকটা ছাড়িয়া দিয়াছিল। পরে নবী যখন তাহাকে (গোপন কথা প্রকাশ করার) এই ব্যাপারটি বলিলেন, তখন সে জিজ্ঞাসা করিল, আপনাকে ইহা কে জানাইয়া দিল? নবী বলিলেন, ‘আমাকে জানাইয়া দিয়াছেন তিনি যিনি সবকিছুই জানেন এবং সর্বজ্ঞ৪।

৪.তোমরা দুইজন যদি আল্লাহর নিকট তওবা কর (তবে ইহা তোমাদের পক্ষে উত্তম), কেননা তোমাদের দিল সঠিক-নির্ভুল পথ হইতে সরিয়া গিয়াছে৫। আর যদি নবীর মুকাবিলায় তোমরা সংঘবদ্ধ হও তাহা হইলে জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ তাহার মালিক; আর তাহার পর জিবরাঈল এবং সমস্ত নেককার ঈমানদার লোক ও সব ফেরেশতা তাহার সঙ্গী-সাথী সাহায্যকারী৬।

৫.অসম্ভব নয় যে, নবী যদি তোমাদের সব কয়জনকে তালাক দিয়া দেয়, তাহা হইলে আল্লাহ্ তাহাকে তোমাদের পরিবর্তে এমন সব স্ত্রী দিবেন, যাহারা তোমাদের অপেক্ষা উত্তম হইবে৭। – সত্যিকার মুসলমান ঈমানদার, আনুগত্যশীল, তওবাকারিণী, ইবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী হউক কিংবা কুমারী।

৬.হে ঈমানদার লোকেরা! নিজেকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে সেই আগুন হইতে রক্ষা কর যাহার ইন্ধন হইবে মানুষ ও পাথর৮। সেখানে অত্যন্ত কর্কশ-রূঢ় নির্মম স্বভাবের ফেরেশতা নিয়োজিত থাকিবে, যাহারা কখনই আল্লাহর হুকুমের অমান্য করে না। আর যে হুকুমই তাহাদিগকে দেওয়া হয়, তাহা ঠিক ঠিকই পালন করে।

টীকাঃ

৪ সে গুপ্ত কথাটি কি ছিল কোন রেওয়ায়েত থেকে নির্দিষ্টরূপে এ কথা জানা যায় না। এবং যে উদ্দেশ্য সামনে রেখে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল সে দিক দিয়ে এ প্রশ্নের আদৌ কোন গুরুত্বও নেই যে, সে গুপ্ত কথাটি কি। যে আসল উদ্দেশ্যের জন্যে কুরআন মজীদে এ ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহর পবিত্র স্ত্রীগণের ও পরোক্ষভাবে মুসলমানদের সমস্ত দায়িত্বশীল লোকদের স্ত্রীদেরকে এ সম্পর্কে সতর্ক করা যে তাঁরা গুপ্ত কথা হিফাযত করার করার ব্যাপারে যেন অসাবধানতা অবলম্বন না করেন। তিনি যত বড় মর্যাদার অধিকারী তাঁর গৃহের গুপ্ত কথা প্রকাশ পাওয়া ততই ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কথা গুরুত্বপূর্ণ হোক বা গুরুত্বপূর্ণ না হোক, গোপন রহস্য হিফাযত করার ব্যাপারে অবহেলার অভ্যাস থাকলে লঘু কথার মতো কোন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাও প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।

৫ এই দু’জন বলতে- হযরত ওমর (রা.)-এর বর্ণনা মতে হযরত আয়েশা (রা.) ও হযরত হাফসা (রা.) কে বোঝানো হয়েছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অর্থ হযরত ওমরের বর্ণনা মতে- এই দুই বিবি হুযুরের সাথে কিছু সাহসের সঙ্গে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন, আল্লাহতা’আলা যা পছন্দ করেননি; এবং সেজন্য তাঁদের ভর্ৎসনা করেন।

৬ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর মুকাবিলায় তোমরা দল বেঁধে তোমাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে। কেননা যার অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ্ এবং জিবরাইল ও ফেরেশতা ও সমস্ত সৎ মু’মিনরা যাঁর সঙ্গে আছেন তাঁর মুকাবিলায় দল বেঁধে কেউই সফলকাম হতে পারে না।

৭ এ থেকে জানা যায়- দোষ মাত্র হযরত আয়েশা (রা.)- ও হযরত হাফসারই (রা.) ছিল না, বরং রাসুল্লাহর অন্যান্য পবিত্রা বিবিগণও কিছু না কিছু দোষী ছিলেন। এ জন্যে তাঁদের দু’জনের পর এই আয়াতে বাকী সব বিবিগণকেও ভর্ৎসনা করা হয়েছে। হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় সে সময়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবিদের প্রতি এতদূর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে, এক মাস পর্যন্ত তিনি তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি, এবং সাহাবাদের মধ্যে একথা রটে যায় যে- তিনি তাঁর বিবিদের তালাক দিয়েছেন।

৮ এ আয়াত থেকে জানা যায়- এক ব্যক্তির দায়িত্ব মাত্র নিজেকেই খোদার শাস্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা করা পর্যন্ত সীমিত নয়, বরং প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা ব্যবস্থা যে পরিবারের কর্তৃত্ব তার উপর অর্পণ করেছে, নিজের সাধ্যমত তাদের এরূপ শিক্ষা-দীক্ষা দান করাও তার দায়িত্ব- যাতে তারা খোদার পছন্দনীয় মানুষরূপে গড়ে উঠতে পারে, এবং যদি তারা জাহান্নামের পথে চলে তবে যথাসাধ্য তাদেরকে সে রাস্তা থকে বিরত রাখার চেষ্টা করা। ‘জাহান্নামের ইন্ধন হইবে পাথর’ অর্থাৎ পাথরের কয়লা সম্ভাবতঃ। ইবনে মাসউদ (রা.), ইবনে আব্বাস (রা.), মোজাহেদ (রা.), ইমাম মোহাম্মদ বাকের (রা.) সুদ্দি (রা.) বলেন- গন্ধকের পাথর।