প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

উপাস্য

ব্যাকরণ বিধি অনুযায়ী উপাসনা বিশেষ্য, বিশেষণ হচ্ছে উপাস্য। উপাস্য অর্থ হচ্ছে যার উপাসনা করা যায়। যিনি উপাসনা পাওয়ার যোগ্য। আরাধনা, পূজা, অর্চনা, ভগবৎচিন্তা ইত্যাদি হচ্ছে উপাসনা, যার উদ্দেশ্যে তা করা হয়, তিনি উপাস্য।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলমানরা আল্লাহর উপাসনা করেন, না তার এবাদত বা বন্দেগী করেন? জ্বীন ও মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হচ্ছে আল্লাহর এবাদত। এ কথা কালামে পাকে আল্লাহই ঘোষণা করেছেন। সুতরাং আল্লাহর বিধান যারা মানে, আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ মানে, তারা আল্লাহর গোলাম বা আব্দ হয়ে তার বন্দেগী করে, কিন্তু তার উপাসনা করে না। এ উপাসনা তো ভগবান, ঈশ্বর ও দেবতার ক্ষেত্রে। তারা উপাসনাকারীদের উপাস্য। মুসলমানরা করে আল্লাহর ইবাদত, কোন নবী-রাসূলেরও নয়। এ এবাদতের ব্যপ্তি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। এ এবাদতের নিয়ম কি? নিয়ম একটাই। আল্লাহ যেভাবে এবাদত করতে বলেছেন এবং প্রাকটিক্যাল আমলের সর্বোত্তম ও সুন্দরতম মডেল তার হাবীবের জীবনাচরিত ও জীবনাচরণ এবং কর্মের মাধ্যমে দুনিয়ার সামনে রেখেছেন, এরই অনুশীলন, অনুসরণ ও অনুকরণের নাম এবাদত। এবাদত আবশ্যিক, কিন্তু উপাসনা ঐচ্ছিক। এবাদত না করলে বান্দাহর দায়িত্ব আদায় হয় না, উপাসনা না করলে দায়িত্বের প্রশ্ন উঠে না।

এ জন্য উপাসনা আর এবাদতে আসমান-জমিন ফারাক। সুরা কাফেরুনে পরিষ্কারভাবে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, বলে দাও, হে কাফেররা, আমি এবাদত করি না তোমরা যার এবাদত কর। তোমরা এবাদতকারী নও যার এবাদত আমি করি। আমি এবাদতকারী নই যার এবাদত তোমরা কর। তোমরা এবাদতকারী নও যার এবাদত আমি করি। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন।

এই সূরার বাক্যগুলোতে একই শব্দ প্রায় প্রত্যেক বাক্যে এসেছে। সেই শব্দটি হচ্ছে এবাদত। এই শব্দটি আল্লাহ পাক আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে উচ্চারণ করিয়েছেন এবাদত অর্থে, অথচ কাফেরদের বেলায় তা হয়েছে উপাসনা অর্থে। এবাদত যদি উভয় ক্ষেত্রে একই অর্থবোধক হতো, তাহলে মাবুদও এক হতেন, দ্বীন নিয়ে কোন ফ্যাসাদ হতো না।
এই সুরাই পরিষ্কার করে দিচ্ছে, মুসলমানরা আল্লাহকে পূজা করে না, তার আরাধনা করে না, তার উপাসনা করে না, বরং করে তার বন্দেগি, তার এবাদত এবং তার এতেয়াত। তাই এবাদত যার করা যায়, তার উপাসনা করা যায় না। আবার উপসনা যার করা যায়, তার এবাদত করা যায় না। উপাসনা আর উপাস্য আমাদের ব্যবহার উপযোগী শব্দ নয়। আমাদের শব্দ ভান্ডারে রয়েছে এবাদত, মাবুদ ইত্যাদি কতো শব্দ। ইসলামের পরিভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে, যাদের তরজমাও হয় না।
অযুর তরজমা কি হবে? অযুর ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু তরজমা করা যায় না। বাংলা ভাষায় এমন কোনো শব্দ নেই, যা দিয়ে এক বা দুশব্দে তা প্রকাশ করা সম্ভব। সিয়ামকে রোজা দিয়ে ভাষান্তরও করা যায়, কিন্তু উপবাসে সেই অর্থ প্রকাশ পায় না।

একেশ্বরবাদ

একেশ্বরবাদ মানে এক ঈশ্বরবাদ। অদ্বিতীয় ঈশ্বর মতবাদ। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে একেশ্বরবাদ-এর অর্থ করা হয়েছে এভাবে, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এই দার্শনিক মত, অদ্বৈতবাদ। একেশ্বরবাদী অর্থ করা হয়েছে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এই মতে বিশ্বাসী।

বাংলা একাডেমী কোন যুক্তি এবং প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে ঈশ্বর আর আল্লাহকে এক মনে করলেন এবং একই অর্থবোধক বলে চালিয়ে দিলেন, তা বুঝলাম না। কর্তৃপক্ষীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেও ব্যাখ্যা পাইনি।

বাংলা একাডেমীই শুধু এই ভুল করেননি, বাংলা ভাষাভাষী অনেক মুসলিম লেখকও একই ভুল করে আসছেন। অনেকে তওহীদ শব্দটি না লেখে একেশ্বরবাদ লেখে থাকেন। কেউ কেউ লেখেন অর্থের দিকে খেয়াল না করে আর কেউ লেখেন অন্যদের অন্ধ অনুসরণ করে। যিনি বা যারা যে কোন কারণেই তওহীদে পরিবর্তে একেশ্বরবাদ গ্রহণ করুন না কেন, তারা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক বা বেখেয়ালের কারণেই হোক, আল্লাহকে বাদ দিয়ে ঈশ্বরকে যে গ্রহণ করেছেন, তাকি ভেবে দেখেছেন? তওহীদ শুধু আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, ঈশ্বরের ক্ষেত্রে নয়। ঈশ্বরের ঈশ্বরী আছে, ঐশী আছে, ভগবানের আছে ভগবতী।
হিন্দু শাস্ত্র মতে, প্রত্যেক দেবদেবী উপাস্য, গোটা সৃষ্টিতে রয়েছে তাদের ভাগাভাগি দায়-দায়িত্ব। কিন্তু আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। গোটা সৃষ্টির একক স্রষ্টা তিনি। সার্বভৌমত্বের কেএত্র বা কোন ক্ষেত্রে অংশীদারীত্বের ভাগাভাগি নেই আল্লাহর। তার কোন স্ত্রী নেই, নেই কোনো আওলাদ, তিনিও কারো আওলাদ নন। সুতরাং অদ্বিতীয় বা ওয়াহিদ, আহাদ বা তওহীদ শব্দ শুধু লা শরীক আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অন্য কারো ক্ষেত্রেও নয়। যে সব মুসলিম লেখক একেশ্বরবাদী বলতে এক আল্লাহতে বিশ্বাসীদের বুঝে থাকেন বা বুঝিয়ে থাকেন, তাদের এই বুঝটার সূত্র, উৎস কি, তা জানতে পারলে চিন্তা-ভাবনা করে দেখতাম, তাদের অবস্থান কাহাতক শক্ত ভিত-নির্ভর।

মুসলমানরা তওহীদপন্থী, তওহীদের অনুসারী এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। আল্লামা ইকবাল বলেছেন, তওহীদ কি আমানত সিনোওমে হ্যায় হামারে, মমকিন নাহি হ্যায় মিটানা নামও নিশান হ্যামারে। এবার চিন্তা করে দেখুন, যে সীনাতে তওহীদের আমানত সেই সীনাতে তো আল্লাহরই স্থান, ঈশ্বরের স্থান নয়। আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমরা ঈশ্বরকে কিভাবে কলবে রাখি ? যে ভুল আমরা করে আসছি, সে ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, সে দিকে তওহীদপন্থীদের খেয়াল থাকা উচিত।