প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানী যে, তিনি নেককার বান্দাদের জন্য এমন কিছু মৌসুম করে দিয়েছেন, যেখানে তারা প্রচুর নেক আমল করার সুযোগ পায়, যা তাদের দীর্ঘ জীবনে বার বার আসে আর যায়। এসব মৌসুমের সব চেয়ে বড় ও মহত্বপূর্ণ হচ্ছে জিলহাজ মাসের প্রথম দশদিন।

জিলহাজ মাসের ফযীলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের কতক দলীল

১. আল্লাহ তাআলা বলেন :

কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের। (সূরা ফাজর : ১-২) ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য জিলহাজ মাসের দশদিন।

২. আল্লাহ তাআলা বলেন :

তারা যেন নির্দি দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (হজ : ২৮) ইবনে আব্বাস বলেছেন : অর্থাৎ জিলহাজ মাসের প্রথম দশদিন।

৩. ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ দিনগুলোর তুলনায় কোনো আমল-ই অন্য কোন সময় উত্তম নয়। তারা বলল : জিহাদও না? তিনি বললেন জিহাদও না, তবে যে ব্যক্তি নিজের জানের শঙ্কা ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, অত:পর কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি। (বুখারী)

৪. ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট কোন দিন প্রিয় নয়, আর না তাতে আমল করা, এ দশ দিনের তুলনায়। সুতরাং তাতে তোমরা বেশী করে তাহলীল , তাহমীদ ও তাকবীর পাঠ কর। (তাবারনী ফীল মুজামিল কাবীর

৫. সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহর অভ্যাস ছিল, যিনি পূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসের হাদিস বর্ণনা করেছেন :

যখন জিলহজ মাসের দশ দিন প্রবেশ করত, তখন তিনি খুব মুজাহাদা : করতেন, যেন তার উপর তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। (দারামী, হাসান সনদে)

৬. ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন :

জিলহাজ মাসের দশদিনের ফযীলতের তাৎপর্যের ক্ষেত্রে যা স্প, তা হচ্ছে এখানে মূল ইবাদাতগুলোর সমন্বয় ঘটছে। অর্থাৎ সালাত, সিয়াম, সাদকা ও হজ্ব যা অন্যান্য সময় আদায় করা যায় না। (ফাতহুল বারী)

৭. উলামায়ে কেরাম বলেছেন :

জিলহাজ্ব মাসের দশ দিন সর্বোত্তম দিন, আর রমযান মাসের দশ রাত সব চেয়ে উত্তম রাত।

এ দিনগুলোতে যেসব আমল করা মুস্তাহাব :

১. সালাত :

ফরয সালাতগুলো দ্রুত সম্পাদন করা, বেশী বেশী নফল আদায় করা। যেহেতু এগুলোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সর্বোত্তম মাধ্যম। সাওবান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : তুমি বেশি বেশি সিজদা কর, কারণ তুমি এমন কোন সিজদা কর না, যার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন না এবং তোমরা গুনাহ ক্ষমা করেন না। (মুসলিম) এটা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য)

২. সিয়াম :

যেহেতু অন্যান্য নেক আমলের মধ্যে সিয়ামও অন্যতম, তাই এ দিনগুলোতে খুব যতেœর সাথে সিয়াম পালন করা। হুনাইদা বিন খালেদ তার স্ত্রী থেকে সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহাজ্ব মাসের নয় তারিখ, আশুরার দিন ও প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা পালন করতেন। (ইমাম আহমদ, আবুদাউদ ও নাসায়ী) ইমাম নববী জিলহাজ্ব মাসের শেষ দশ দিনের ব্যাপারে বলেছেন। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব।

৩. তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ :

পূর্বে ইবনে ওমরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : তাতে রয়েছে, তোমরা বেশী বেশী তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ পড়। ইমাম বুখারী (রহ) বলেছেন, ইবনে ওমর ও আবুহুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহুমা ও দশ দিন তাকবীর বলতে বাজারের জন্য বের হতেন, মুসলমানরাও তাদের দেখে দেখে তাকবীর বলত। তিনি আরো বলেছেন, ইবনে ওমর মিনায় তার তাবুতে তাকবীর বলতেন, মসজিদের লোকেরা তা শুনত, অত:পর তারা তাকবীর বলত এবং বাজারের লোকেরাও, এক পর্যায়ে পুরো মিনা তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত।

ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু এ দিনগুলোতে মিনায় তাকবীর বলতেন, প্রত্যেক সালাতের পর, বিছানায়, তাঁবুতে, মজলিশে ও চলার পথে। স্বশব্দে তাকবীর বলা মুস্তাহাব। যেহেতু ওমর, ইবনে ওমর ও আবু হুরারয়রা শব্দে তাকবীর বলেছেন। মুসলমান হিসাবে আমাদের উচিত, এ সুন্নতগুলো জীবিত করা, যা বর্তমান যুগে প্রায় পরিত্যক্ত এবং ভুলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, এমনকি নেককার লোকদের থেকেও, অথচ আমাদের পূর্বপুরুষেরা এমন ছিলেন না।

৪. আরাফার দিন রোজা :

হাজী ছাড়া অন্যদের জন্য আরাফার দিনের রোজা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমানিত, তিনি আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে বলেছেন : আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, ইহা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহর কাফ্ফারা হবে। (মুসলিম)

৫. নহরের দিন তথা দশই জিলহজের ফযীলত :

এ দিনগুলোর ব্যাপারে অনেক মুসলমানই গাফেল, অথচ অনেক আলেমদের নিকট নি:শর্তভাবে এ দিনগুলো উত্তম, এমনকি আরাফার দিন থেকেও। ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম দিন, নহরের দিন। আর তাই হজ্জে আকবারের দিন। যেমন সুনানে আবুদাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় দিন হলো নহরের দিন। অত:পর মিনায় অবস্থানের দিন। অর্থাৎ এগারোতম দিন। কেউ কেউ বলেছেন : আরাফার দিন তার থেকে উত্তম। কারন, সে দিনের সিয়াম দুই বছরের গুনাহর কাফ্ফারা। আল্লাহ আরাফার দিন যে পরিমান লোক জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন, তা অন্য কোন দিন করেন না। আরো এ জন্যও যে, আল্লাহ তাআলা সে দিন বান্দার নিকটবর্তী হন এবং আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। তবে প্রথম বক্তব্যই সঠিক : কারণ, হাদীস তারই প্রমান বহন করে, এর বিরোধী কিছু নেই। যাই হোক, উত্তম হয় আরাফার দিন, নয় মিনার দিন, হাজী বা বাড়িতে অবস্থানকারী সবার উচিত সে দিনের ফযীলত অর্জন করা এবং তার মুহূর্তগুলো থেকে উপকৃত হওয়া।

ইবাদাতের মৌসুমগুলো আমরা কিভাবে গ্রহণ করব:

প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য ইবাদাতের মৌসুমগুলোতে বেশী বেশী তাওবা করা। গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। কারণ, গুনাহ মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রাখে। গুনাহ ব্যক্তির অন্তর ও আল্লাহর মাঝে বাধাঁর সৃি করে। বান্দার আরো উচিত কল্যাণকর ও শুভদিনগুলোতে এমন সব আমল ও কাজে নিয়োজিত থাকা, যা আল্লাহর সন্তুরি কারণ। যে আল্লাহর সাথে সত্যতার প্রমাণ দেবে আল্লাহও তার সাথে তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়ন করবেন। তিনি বলেন : আর যারা আমার পথে সর্বাত্বক প্রচো চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। (আনকাবূত : ৬৯) তিনি অন্যত্র বলেন :আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (আলে ইমরান : ১৩৩)

হে মুসলিম ভাই, এ গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তগুলোর জন্য সজাগ থাক, তার প্রতি দৃি নিবন্ধ রাখ, তা যেন কোনভাবেই তোমার থেকে অবহেলায় অতিবাহিত না হয়। ফলে তুমি লজ্জিত হবে, কিন্তু তোমার লজ্জা সেদিন কোন কাজে আসবে না। কারণ, দুনিয়া ছায়ার ন্যায়। আজকে আমরা কর্মস্থলে অবস্থান করছি আগামিকাল অবস্থান করব প্রতিদান ও হিসাব-নিকাশের দিবসে, জান্নাত কিংবা জাহান্নামে। তুমি তাদের মত হও, এ আয়াতে আল্লাহ যাদের উল্লেখ করেছেন: তারা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী। (আম্বিয়া : ৯০)