প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আপন রসনার সদ্ব্যবহার করা একান্ত কর্তব্য। সূক্ষ্মতত্ত্বজ্ঞ বিদ্বানগন বলিয়াছেন, খোদা তাআলা দুইটি চক্ষু ও একটি জিহবা প্রদান করিয়াছেন, উদ্দেশ্য এই যে, মনুষ্যের দর্শন অপেক্ষা কথন অল্প হওয়া আবশ্যক। খোদাতাআলা এক জিহবার জন্য অধরদ্বয়কে দুইজন রক্ষকস্বরূপ নিযুক্ত করিয়াছেন। যেন উভয়ে জিহবাকে আয়ত্তাধীনে রাখিতে পারে। কোরআনে বর্নিত আছে মানুষ্য যে কোন কথা বলে, উহার জন্য এক জন রক্ষক নিয়োজিত আছেন।
ইমাম বোখারীর বর্ণনা, নিশ্চয় মনুষ্য বিনা দ্বিধায় খোদার সন্তোষজনক এরূপ এক কথা বলিয়া থাকে যে, যাহার জন্য খোদাতাআলা তাহাকে বহু উচ্চপদ প্রদান করেন।
যে ব্যক্তি (অসৎ কথা হইতে) মৌনাবলম্বন করিবে, সে ব্যক্তি মুক্তি লাভ করিবে।
ইমাম বোখারী ও মোছলেমের বর্ণনা যে ব্যক্তি খোদা ও কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন সৎকথা বলে কিংবা মৌনাবলম্বন করিয়া থাকে।
ইমাম শাফীয়ি বলিয়াছেন, যে সময় কেহ কোন কথা বলিতে ইচ্ছা করে, তখন সে যেন প্রথমে তাহার বিবেকের নিকট তৎবিষয়ে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করে। যদি বিবেকের বিচার উক্ত কথায় লাভ ভিন্ন পার্থিব বা ধর্ম সংক্রান্ত কোন ক্ষতি না হয়, তবে উহা বলিতে পারে, নতুন বলা সিদ্ধ নহে। প্রাচীন লোকেরা বলিয়াছেন, যেরূপ বিনাশকারী সর্প গর্তে থাকে, সেইরূপ রসনা একটি বিনাশকারী সর্প মুখগহ্বরে স্থিতি হবে।
জিহ্বার দোষ
প্রথম দোষ : গালি দেওয়া
ছহিহ্ বোখারী ও মোছলেমে আছে, যদি একজন লোক অন্য লোককে ফাছেক (পাপী) কিংবা কাফের বলিয়া গালি দেয়, এক্ষেত্রে যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি তদ্রুপ না হয়, তবে উক্ত কথা প্রথম ব্যক্তির উপর পতিত হয়।
আলমগীরিতে আছে, যদি একজন লোক কোন মুসলমান ভ্রাতাকে কাফের বলে এবং এই দ্বিতীয় লোকটি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে ফকিহ্ আবু বকর আমশ বালাখির মতে প্রথম ব্যক্তি কাফের হইবে।
বালাখের অন্যান্য ইমামগণ বলেন যে, প্রথম ব্যক্তি কাফের হইবে না। ফৎওয়া গ্রাহ্যমতে যদি এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি তাহাকে কাফের ধারণা না করিয়া থাকে, বরং গালি দেওয়া ধারণায় ঐরূপ বলিয়া থাকে, তবে সে (গোনাহ্গার) হইবে, কাফের হইবেনা, আর যদি তাহাকে কাফের হইবার ধারণায় এরূপ বলিয়া থাকে, তবে সে কাফের হইয়া যাইবে। (জখিরা)
আবু দাউদ ও তিরমিজি এই হাদিছটি বর্ণনা করিয়াছেন, তোমরা কোন লোককে অভিসম্পাত প্রদান করিও না, খোদার কোপ ও দোজখের অভিশাপ দিও না।
ছহিহ্ বোখারী ও মোছলেমে বর্ণিত আছে যে, কাহাকেও খোদার শত্র বলিও না। মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসিকি কার্য (গোনাহ্)।
দোর্রে মোখতারে আছে, যদি কেহ মুসলমানকে পিশাচ, ফাছেক, চোর, বিশ্বাসঘাতক, নির্বোদ, ডাকাত, কোট্না ভেডুয়া, মদ্যপায়ী, কুশীদজীবি (সুদখোর), বৈশ্যাপুত্র, কাফের পুত্র, জারজ, গর্দভ, কুকুর, শুকর, বানর, বলদ ও সর্প ইত্যাদি বলিয়া গালি দেয়, তবে এইরূপ কটুভাষা প্রয়োগকারীকে তিন হইতে ৩৯ বেত মারিতে হইবে।
তিরমিজি হযরত এর এই হাদিছটি বর্ণনা করিয়াছেন, ঈমানদার ব্যক্তি নিন্দাকারী, অভিসম্পাত প্রদানকারী, কটুভাষী ও অশ্লীল ভাষা প্রয়োগকারী হইবে না।
অবু দাউদের বর্ণনা, যখন কোন ব্যক্তি বস্তুর উপর অভিসম্পাত (লানত) প্রদান করে, তখন উক্ত অভিসম্পাত আকাশের দিকে উত্থিত হইতে থাকে। আকাশের দ্বারসমুহ রুদ্ধ হইয়া যায়। অনন্তর উক্ত অভিসম্পাত ভূমির দিকে অবতীর্ণ হয়, ভূমির ছিদ্রসমুহ বন্ধ হইয়া যায়। সেই সময় উহা ডাহিন ও বাম দিকে ভ্রমণ করিতে থাকে। যখন কোন প্রবেশ স্থান প্রাপ্ত না হয়, তখন যাহার প্রতি অভিসম্পাত করা হইয়াছে, তাহার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যদি সে ব্যক্তি উপযুক্ত হয়, (তবে তাহার উপর পতিত হয়), নচেৎ উহা অভিসম্পাত প্রদানকারীর উপর পতিত হয়।
আবু দাউদ ও তিরমিজির বর্ণনা এক ব্যক্তি বায়ুর উপর অভিসম্পাত প্রয়োগ করিয়াছিল, তৎশ্রবণে হযরত বলিয়াছিলেন যে, বায়ুকে অভিসম্পাত করিও না; কেননা উহা খোদার হুকুমে প্রবাহিত হয়। যে ব্যক্তি কোন দির্দোষ বস্তুর প্রতি অভিসম্পাত প্রদান করে, সে নিজেই অভিসম্পাতগ্রস্থ হইয়া যায়।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা লোকে যে ব্যক্তিকে তাহার অশ্লীল ভাষার ভয়ে পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি বিচার দিবসে খোদার নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হইবে।
দ্বিতীয় দোষ : মিথ্যা বাক্য বলা
তোমরা সত্য কথা বল, কেননা সত্যকথা তোমাদিগকে (নেকীর) পথ প্রদর্শন করিবে এবং (নেকী) তোমাদিগকে বেহেশতের পথ প্রদর্শন করিবে। মনুষ্য সর্বদা সত্য কথা বলিতে থাকে এবং সত্য কথা বলার প্রয়াস পাইতে থাকে, এমন কি খোদাতায়ালার নিকট সত্যবাদী বলিয়া লিখিত হয়। তোমরা মিথ্যাকথা হইতে বিরত থাক, কেননা মিথ্যা তোমাদিগকে অসৎ কার্যের পথ প্রদর্শন করে। মনুষ্য সর্বদা মিথ্যা কথা বলিতে থাকে এবং মিথ্যা কথা বলিতে প্রয়াস পাইয়া থাকে, এমনকি খোদার নিকট মিথ্যাবাদী নামে অভিহিত হয়।
ইমাম তিরমিজির বর্ণনা যে ব্যক্তি বাতিল বাক্য ত্যাগ করে, তাহার জন্য বেহেশ্তের এক পার্শ্বে অট্টালিকা নির্মাণ করা হইবে। যে ব্যক্তি সত্যপরায়ণ হইয়া কলহ করা ত্যাগ করে, তাহার জন্য বেহেশ্তের মধ্যদেশে প্রাসাদ (বালাখানা) প্রস্তুত করা হইবে। আর যে ব্যক্তি চরিত্র গঠন করে, তাহার জন্য বেহেশ্তের উচ্চস্থানে গৃহ নির্মাণ করা হইবে।
যখন মনুষ্য মিথ্যা বাক্য বলে, তখন উক্ত মিথ্যা বাক্যের দুর্গন্ধে ফেরেশ্তা এক মাইল দূরে চলিয়ে যান।
ইমাম আহমদের বর্ণনা বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যা ব্যতীত মুসলমানের সকল প্রকার চরিত্র হইতে পারে।
ইমাম মালেকের বর্ণনা হযরতকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, ঈমানদার ব্যক্তি কি ভীরু হইয়া থাকে? তদুত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, হাঁ হইতে পারে। তৎপরে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, ঈমানদার ব্যক্তি কি কৃপণ হইতে পারে? তিনি বলিয়াছিলেন যে হাঁ হইতে পারে। তৎপরে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, ঈমানদার ব্যক্তি কি মিথ্যাবাদী হইতে পারে? তিনি বলিয়াছিলন যে, না।
ইমাম মোছলেমের বর্ণনা খোদা কিয়ামাতের দিবস যে তিন ব্যক্তির সহিত কথা বলিবেন না, যাহাদিগকে গোনাহ্ মুক্ত করিবেন না এবং যাহাদের দিকে দৃষ্টিপাত করিবেন না, তাহাদের মধ্যে মিথ্যাবাদী বাদশাহ্ একজন।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা যে ব্যক্তির মধ্যে চারিটি রীতি থাকে, সে বিশুদ্ধ মোনাফেক (কপট) যাহার মধ্যে উহার একটি রীতি আছে। তাহার মধ্যে মোনাফেকের একটি চরিত্র আছে। তাহার নিকট কোন বস্ত গচ্ছিত রাখিলে, সে উহা নষ্ট করে, কথা বলিতে গেলে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করিলে, উহা পূর্ণ করে না এবং বচসা করিলে এবং অশ্লীল কথা বলে।
আবু দাউদের বর্ণনা আবদুল্লাহ নামক একটি লোক হযরতের সহিত ক্রয় বিক্রয় করিয়া বলিয়াছিল যে, আপনি এই স্থানে দণ্ডায়মান হউন, আমি আসিতেছি। আবদুল্লাহ তিন দিবস হযরতের কথা ভুলিয়াছিল, তৎপরে সেই স্থানে আসিয়া হযরতকে তথায় দেখিল। হজরত বলিলেন তুমি আমাকে কষ্টে নিক্ষেপ করিয়াছিলে।
এস্থলে হযরত অঙ্গীকার পূর্ণ করার চূড়ান্ত নিদর্শন প্রদর্শন করিয়াছেন।
তিরমিজির বর্ণনা এবনে আমের বলেন, হযরত আমাদের গৃহে উপবেশন করিয়াছিলেন। এমতাবস্থায় আমার মাতা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, এস তোমাকে কিছু দিব। হযরত বলিলেন তুমি কি দিবার ইচ্ছা করিয়াছিলে? তিনি বলিলেন একটি খোর্মা দিবার ইচ্ছা করিয়াছিলাম। হযরত বলিলেন, যদি তুমি তোমার পুত্রকে উহা প্রদান না কর, তবে তোমার জন্য একটি মিথ্যা কথার গোনাহ্ লেখা যাইবে।
আবু দাউদ ও তিরমিজির বর্ণনা যে ব্যক্তি তাহার ভ্রাতার সহিত অঙ্গীকার করে এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করার তাহার একান্ত ইচ্ছা থাকে, (কোন আপত্তি বশতঃ) নির্দিষ্ট সময়ে উহা পূর্ণ করিতে পারিল না, এক্ষেত্রে তাহার গোনাহ্ হইবে না।
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা হযরত বলিয়াছেন, আমার সময়, তাবিয়ীদিগের সময় ও তাবে তাবিয়ীদিগের সময় উত্তম। তৎপরে একদল লোক হইবে তাহারা সাক্ষ্য প্রদান করিবে অথচ তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ হইবে না। তাহারা শপথ করিবে, অথচ তাহাদের শপথ গ্রাহ্য করা হইবে না।
যে ব্যক্তি শপথ করিয়া মুসলমান ভ্রাতার স্বত্ব (হক) নষ্ট করে। খোদাতায়ালা তাহার জন্য বেহেশ্ত হারাম করিবেন।
ইমাম বোখারীর বর্ণনা হযরত একজন ফেরেশ্তার হস্তে একখণ্ড লৌহের আকর্ষণী দেখিয়াছিলেন তিনি উহা একজন লোকের মুখের একদিকে প্রবেশ করাইয়া দিয়া উহা কর্তন করিয়া গ্রীবাদেশ পর্যন্ত লইয়া যাইতেছিলেন। তৎপরে অন্যদিকে ঐরূপ করিতেছিলেন। একদিক কর্তন করিয়া ফেলিলে তৎক্ষণাৎ উহা সুস্থ হইয়া যাইতেছিল, এইরূপ কেয়ামত পর্যন্ত করিতে থাকিবেন। এই ব্যক্তি মিথ্যা বাক্য বলিত এবং তাহার এই মিথ্যা দেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল।
যে ব্যক্তি মিথ্যা কথাকে আমার হাদিস বলিয়া প্রকাশ করে, সে যেন দোজখে নিজের স্থান নির্দেশ করিয়া রাখে।
ইমাম মোছলেমের বর্ণনা যে ব্যক্তি যাহাই শ্রবণ করে তাহাই প্রকাশ করে, সেই ব্যক্তিও মিথ্যাবাদীদের দলভুক্ত।
যে ব্যক্তি জ্ঞানগোচরে জাল কথাকে আমার হাদিস বলিয়া প্রকাশ করে, সে ব্যক্তিও একজন মিথ্যাবাদী। পাঠক, মনে রাখিবেন, উপদেষ্টা বিদ্বানগণ যেন বিশ্বাসযোগ্য কেতাব বা ছনদ ব্যতীত যে সে কেতাবের কিংবা বিনা ছনদের হাদীছ প্রকাশ করিয়া জাহান্নামী না হন।(পরের সংখ্যায় দেখুন)
